
শহরের একটি ব্যস্ত সংবাদসম্পাদনা কেন্দ্রে প্রতিদিন শত শত খবর এসে জমা হতো। কোথাও দুর্ঘটনা, কোথাও রাজনৈতিক বক্তব্য, কোথাও মানুষের সাফল্য, আবার কোথাও এমন ঘটনা, যা প্রকাশ্যে আসার আগেই বহু মানুষের জীবন বদলে দিত। সেই কেন্দ্রের রাতের শিফটে কাজ করতেন সংবাদসম্পাদক অদিতি রায়।
অদিতির একটি অভ্যাস ছিল—কোনও গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশের আগে তিনি সাত মিনিট চুপ করে বসতেন। সহকর্মীরা প্রথমে বিষয়টিকে অদ্ভুত মনে করত। কেউ ভাবত, তিনি হয়তো ক্লান্তি কাটান। কেউ আবার মজা করে বলত, “খবরের পৃথিবীতে সাত মিনিট নীরব থাকার সময় কোথায়?”
অদিতি কখনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতেন না। শুধু বলতেন, “সব খবর দ্রুত প্রকাশ করতে হয়, কিন্তু সব খবর দ্রুত প্রকাশ করা উচিত নয়।”
এক রাতে সম্পাদনা কেন্দ্রে একটি ভিডিও এল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, একটি আবাসিক এলাকার বাইরে কয়েকজন মানুষ উত্তেজিতভাবে এক তরুণকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ চিৎকার করছে, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে। ভিডিওর সঙ্গে একটি বার্তাও ছিল—তরুণটি নাকি এলাকার একটি গুরুতর অপরাধে জড়িত।
ভিডিওটি কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। একটি জনপ্রিয় পেজ দাবি করেছিল, অভিযুক্তের পরিচয় নিশ্চিত। অন্য একটি পেজ তার ছবি প্রকাশ করে মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিল।
সংবাদকেন্দ্রের তরুণ প্রতিবেদক রণিত উত্তেজিত হয়ে অদিতির কাছে এল।
“ম্যাডাম, ভিডিওটা ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা এখনই খবরটা প্রকাশ করলে অনেক পাঠক পাব।”
অদিতি জিজ্ঞাসা করলেন, “তথ্য যাচাই করেছ?”
রণিত বলল, “ভিডিওটা একাধিক পেজে আছে। সবাই একই কথা বলছে।”
“একই ভিডিও অনেক পেজে থাকা কি স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়ার প্রমাণ?”
রণিত থমকে গেল।
অদিতি ভিডিওটি আবার চালালেন। কয়েকবার দেখার পর তিনি লক্ষ করলেন, দৃশ্যের শুরু নেই। তরুণটি কী বলেছিল, তার আগে কী ঘটেছিল, কিংবা ঘটনাটি ঠিক কখন রেকর্ড করা হয়েছিল—কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
তিনি রণিতকে বললেন, “প্রথমে ঘটনাস্থলের তথ্য নাও। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য চাও। ভিডিওটির মূল উৎস খোঁজো। আর অভিযুক্ত বলে যাঁর ছবি ছড়ানো হচ্ছে, তাঁর পরিচয় যাচাই না করে কোনও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করবে না।”
রণিত বলল, “কিন্তু অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো তো প্রকাশ করছে।”
অদিতি উত্তর দিলেন, “অন্য কেউ ভুল করলে আমাদেরও ভুল করতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।”
সেদিন সাত মিনিটের নীরবতা একটু দীর্ঘ হলো। অদিতি চেয়ারে বসে নিজের নোটবুকে তিনটি প্রশ্ন লিখলেন—আমরা কী জানি? কী জানি না? আর ভুল হলে কার ক্ষতি হতে পারে?
প্রথম প্রশ্নের উত্তরে লেখা গেল, একটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এবং তার একটি অসম্পূর্ণ ভিডিও ছড়িয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর অনেক দীর্ঘ। ঘটনার কারণ অজানা, অভিযোগের সত্যতা অজানা, ভিডিওর সময় ও স্থান পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভুল পরিচয় প্রকাশ হলে নির্দোষ একজন মানুষ সামাজিক অপমান, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
পরের এক ঘণ্টা ধরে রণিত বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করল। পুলিশ জানাল, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অভিযোগের সব তথ্য নিশ্চিত নয়। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন, ভিডিওতে ঘটনার আগের অংশ নেই। তরুণটির বিরুদ্ধে ছড়ানো পরিচয় সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেল না।
শেষ পর্যন্ত সংবাদকেন্দ্র খবর প্রকাশ করল। শিরোনামে কোনও ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণা করা হলো না। বরং জানানো হলো, একটি অসম্পূর্ণ ভিডিওকে কেন্দ্র করে অভিযোগ ছড়িয়েছে, অথচ ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও পরিচয় এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। পাঠকদেরও যাচাইহীন ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ার অনুরোধ করা হলো।
প্রথম দিকে খবরটি অন্য কয়েকটি উত্তেজক পোস্টের তুলনায় কম জনপ্রিয় হলো। রণিতের মন খারাপ হয়ে গেল।
“আমরা এত সময় দিলাম, অথচ পাঠক কম,” সে বলল।
অদিতি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “পাঠকের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাঠককে ভুল পথে চালিত না করাও আমাদের কাজ। বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন।”
পরদিন সকালে তদন্তের নতুন তথ্য প্রকাশ্যে এল। জানা গেল, ভিডিওতে দেখা ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কয়েকটি দাবি ভুল ছিল। অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত তরুণটির পরিচয়ও ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছিল। সংবাদকেন্দ্রের সতর্ক প্রতিবেদনটি তখন বহু মানুষ ভাগ করে নিতে শুরু করল।
রণিত নিজের ডেস্কে বসে আগের রাতের নোটগুলো দেখছিল। সে বুঝতে পারল, অদিতির সাত মিনিটের নীরবতা আসলে সময় নষ্ট করা নয়। সেটি ছিল নিজের তাড়াহুড়োকে প্রশ্ন করার সময়।
কয়েক সপ্তাহ পরে একটি বড় দুর্ঘটনার খবর এল। এবারও সামাজিক মাধ্যমে নানা দাবি ছড়াতে শুরু করল। রণিত খবরটি হাতে নিয়ে অদিতির কাছে গেল না। সে নিজেই যাচাইয়ের তালিকা খুলল—মূল সূত্র, সময়, স্থান, প্রত্যক্ষদর্শী, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং যা এখনও নিশ্চিত নয়।
তারপর সে অদিতিকে বলল, “ম্যাডাম, খবর প্রকাশের আগে সাত মিনিট সময় নিয়েছি।”
অদিতি মৃদু হেসে বললেন, “সাত মিনিটই নিয়ম নয়, রণিত। কখনও এক মিনিট যথেষ্ট, কখনও কয়েক ঘণ্টাও কম। আসল কথা হলো, তাড়াহুড়োর চাপে যেন সত্যকে পিছনে ফেলে না আসি।”
সেদিন থেকে সংবাদকেন্দ্রে একটি নতুন নিয়ম চালু হলো। সংবেদনশীল খবর প্রকাশের আগে প্রতিবেদককে স্পষ্ট করে জানাতে হবে—কোন তথ্য নিশ্চিত, কোনটি এখনও যাচাই করা হচ্ছে, এবং প্রকাশের ফলে কারও অযথা ক্ষতি হতে পারে কি না।
কেউ এই নিয়মকে ধীরগতির কাজ বলল, কেউ বলল অতিরিক্ত সতর্কতা। কিন্তু অদিতি জানতেন, দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্বের বিরোধ নেই। প্রকৃত দক্ষতা হলো, সময়ের চাপের মধ্যেও কোন জায়গায় থামতে হবে তা বুঝতে পারা।
সাত মিনিটের নীরবতা তাই আর শুধু অদিতির ব্যক্তিগত অভ্যাস রইল না। সেটি হয়ে উঠল একটি প্রশ্নের নাম—খবরটি প্রকাশের আগে আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা কী প্রকাশ করতে চলেছি?
শিক্ষা: কোনও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেই তা সত্য হয়ে যায় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাই করা, অনিশ্চয়তা স্বীকার করা এবং নিজের কাজের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝা দায়িত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।












Leave a Reply