সুভাষ চন্দ্র দাশ,ক্যানিং – বয়স প্রায় সত্তরের কোঠায়।হাঁটা-চলার ক্ষমতা না থাকলেও জোর করেই চলাচল করতে হয়ে। পেটের জ্বালা যে বড়ই জ্বালা। এমনই এক চিন্ময়ী রুপের জীবন্ত দূর্গার সাক্ষাৎ ক্যানিংয়ের মাতলা ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের থুমকাঠি এলাকায়।
ঘটনা প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয় বহুকাল আগে। ছোট বেলার চতুর্থ শ্রেণীর বইয়ের পাতায়। সেখানে কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় উল্লেখ করেছিলেন কয়েকটি লাইন।সেটাই আজ বাস্তব।
‘আমি তো বেশ ভাবতে পারি মনে
সূয্যি ডুবে গেছে মাঠের শেষে,
বাগদি-বুড়ি চুবড়ি ভরে নিয়ে
শাক তুলছে পুকুর – ধারে এসে।’
বছর সত্তর বয়সের বৃদ্ধা সুন্দরী অধিকারী।তাঁর জীবনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেও আজও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।শুধু নিজে বাঁচবেন তা নয়। নাতি-নাতনি,ছেলের বৌ যাতে করে দুবেলা দুমুঠো ভাত পায় তার রসদ খুঁজে বেড়ায় বৃদ্ধা।
প্রতিদিন সকালে পূব আকাশে সূয্যি উঁকি দেওয়ার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।মাঠে-ঘাটে,পুকুরে কিংবা খালে বিলে খুঁজে বেড়ান শাক। সেই শাক তুলে এনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বিক্রি করার জন বসেন স্থানীয় থুমকাঠি এলাকায়। কোনদিন সমস্ত শাক বিক্রি হয়,আবার কোনদিনও বিক্রি হয় না।যেদিন যেটুকুই বিক্রি হয় তা দিয়ে চাল,ডাল বাজার হাট করে কোন রকমে দিন গুজরান করেন ওই বৃদ্ধা। বাঙালীর বৃহত্তম উৎসব দুর্গাপুজো। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর পুজোয় মেতে উঠবেন সকলে। নুতুন পোশাক পরে বেরিয়ে পড়বেন, ঠাকুর দেখে আনন্দ করতে।বৃদ্ধা সুন্দরী দেবীর সেই আনন্দ মুছে গিয়েছে বহু কাল আগে।পুজো পার্ব্বণ কি এবং কেন তা তিনি ভুলেই গিয়েছেন জঠরের জ্বালায়।সময় বড়ই বিচিত্র। বাস্তব বড়ই রুক্ষঃ।
বিগত প্রায় ৩০ বছর আগে সুন্দরী দেবীর স্বামী তুলসি অধিকারী মারা যায়।সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে শুরু করেন বেঁচে থাকার লড়াই।এক ছেলে ও এক মেয়ে কে কোন রকমে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলেন। মেয়ে ও ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিলেন।জীবনে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ময়দানে শেষ জীবনে একটু শান্তি চেয়েছিলেন সুন্দরী দেবী।ঠিক সেই মুহূর্তে জীবন সায়াহ্নে নিজের সন্তান কে চিরতরে হারিয়ে বাক্ রুদ্ধ হয়ে পড়েন।গত প্রায় একবছর আগে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় সুন্দরী দেবীর একমাত্র সন্তান গোপাল অধিকারী’র।
জীবন সায়াহ্নে সত্তর উর্দ্ধ বৃদ্ধা সুন্দরী দেবী আবারও সংসারের হাল ধরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন।এক কথায় অবিচল সুন্দরীদেবী। যেন চিন্ময়ী রুপে জীবন্ত দশভূজার আগমন।
স্বামী-সন্তান হারানোর শোক বুকে চেপে শাক তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন চিন্ময়ী রুপের জীবন্ত দূর্গা।












Leave a Reply