একটি অটো-রিকশার স্টিয়ারিং।
আজ শহরের রাস্তায় সেটি হয়তো খুব সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু কয়েক দশক আগে কোনও মহিলাকে অটো চালকের আসনে বসে থাকতে দেখা ছিল অত্যন্ত বিরল।
১৯৮০-এর দশকের ভারতীয় সমাজে গাড়ি চালানোকে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের পেশা হিসেবে দেখা হতো। আর অটো-রিকশা চালানো? সেখানে নারীর উপস্থিতি ছিল আরও অস্বাভাবিক।
ঠিক সেই সময় নিজের জীবনের স্টিয়ারিং নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন শীলা দাওরে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে মহারাষ্ট্রের পরভানি থেকে পুনেতে এসে তিনি এমন একটি পেশা বেছে নেন, যেখানে তখন প্রায় সম্পূর্ণ পুরুষদের আধিপত্য ছিল। ১৯৮৮ সালে অটো চালানো শুরু করার পর তাঁর নাম লিমকা বুক অব রেকর্ডসে দেশের প্রথম মহিলা অটো-রিকশা চালক হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
কিন্তু তাঁর গল্প শুধু ‘প্রথম মহিলা অটোচালক’-এর গল্প নয়।
এটি নিজের পছন্দের পেশাকে বেছে নেওয়া, সামাজিক বাধার সামনে না থামা এবং নিজের শ্রম দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করার গল্প।
ছোটবেলা থেকেই গাড়ির প্রতি আকর্ষণ
শীলা দাওরের ছোটবেলা থেকেই গাড়ি চালানোর প্রতি আগ্রহ ছিল।
তখন কোনও মেয়ের গাড়ি চালানোর ইচ্ছাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হতো না। কিন্তু শীলা সেই আগ্রহকে নিছক শখ হিসেবে দেখেননি।
তিনি চাইতেন গাড়ি চালানোই তাঁর পেশা হোক।
এই ইচ্ছাই একসময় তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ গতিপথ বদলে দেয়।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে পুনের উদ্দেশে রওনা দেন।
সঙ্গে ছিল মাত্র ১২ টাকা।
কাজ নেই।
থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নেই।
ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও নেই।
কিন্তু ছিল নিজের পছন্দের পেশায় কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা।
পুনেতে নতুন জীবন
পুনে শহরে পৌঁছে শীলা বুঝতে পারেন, স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, সেটিকে বাস্তব করা ততটা সহজ নয়।
তিনি অটো-রিকশা ভাড়া নিয়ে চালাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়।
একজন মহিলা অটো চালাবেন—এই ধারণাটিই তখন অনেকের কাছে অস্বাভাবিক ছিল।
তাই সহজে কেউ তাঁকে অটো ভাড়া দিতে চাইছিল না।
পুরুষদের জন্য যে পেশাটি স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো, একজন নারীর জন্য সেটিই হয়ে উঠেছিল একের পর এক দরজা বন্ধ হওয়ার কারণ।
কিন্তু শীলা থেমে যাননি।
তিনি সাহায্যের জন্য একটি মহিলা সংগঠনের কাছে যান। সেই সহায়তায় তিনি নিয়মিত চালকেরা ছুটিতে থাকলে অটো চালানোর সুযোগ পেতে শুরু করেন।
প্রথমে ভাড়ার অটো, পরে নিজের অটো
শুরুর দিনগুলিতে তাঁর আয় ছিল সীমিত।
কিন্তু তিনি অল্প অল্প করে টাকা জমাতে থাকেন।
লক্ষ্য ছিল নিজের একটি অটো কেনা।
এই সময় তাঁর জীবনের প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের।
অন্যদিকে তাঁকে সমাজের নানা মন্তব্য ও কটাক্ষও শুনতে হতো।
কেউ অবাক হয়ে তাকাতেন।
কেউ হাসাহাসি করতেন।
কেউ মনে করতেন, একজন মহিলার এই পেশায় থাকা উচিত নয়।
কিন্তু শীলা তাঁর কাজ দিয়ে উত্তর দেওয়ার পথ বেছে নেন।
অবশেষে সঞ্চয় করে তিনি নিজের অটো কেনার দিকে এগিয়ে যান।
এটি ছিল তাঁর জীবনের একটি বড় মোড়।
কারও দয়া বা অনুমতির ওপর নির্ভর না করে নিজের উপার্জনে নিজের কর্মযান—এই স্বাধীনতা তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
রাস্তাই হয়ে উঠল কর্মক্ষেত্র
পুনের রাস্তায় শীলা যখন অটো চালাতে শুরু করেন, তখন তিনি শুধু একজন চালক ছিলেন না।
তিনি অজান্তেই একটি সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছিলেন।
সেই ধারণাটি ছিল—কিছু পেশা পুরুষদের জন্য, আর কিছু পেশা মহিলাদের জন্য।
অটো চালানো, ট্রাক চালানো, বাস চালানো বা যাত্রী পরিবহন—এসব পেশায় নারীদের উপস্থিতি তখন খুব কম ছিল।
শীলা সেই অদৃশ্য সীমারেখা অতিক্রম করেন।
তিনি যাত্রী নিয়ে রাস্তায় বেরোতেন, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতেন এবং নিজের শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন করতেন।
একসময় তাঁর কাজই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়।
১৯৮৮: ইতিহাসে নাম
১৯৮৮ সাল তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর।
সেই সময় তাঁর নাম Limca Book of Records-এ দেশের প্রথম মহিলা অটো-রিকশা চালক হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
তবে শীলা নিজে রেকর্ড করার লক্ষ্য নিয়ে এই পেশায় আসেননি।
তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল জীবিকা এবং নিজের পছন্দের কাজ করা।
পরবর্তীকালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রেকর্ডে তাঁর নাম উঠবে—এমন ধারণা তাঁর শুরুতে ছিল না।
এখানেই তাঁর গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
কখনও কখনও মানুষ ইতিহাস তৈরি করার জন্য ইতিহাসের পথে হাঁটে না।
সে নিজের কাজটুকু করার চেষ্টা করে।
তারপর সেই কাজই একদিন ইতিহাস হয়ে যায়।
প্রতিদিনের লড়াই
অটো চালানো বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও এটি কঠিন ও পরিশ্রমের পেশা।
দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকতে হয়।
যানজট সামলাতে হয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
শীলা এমন সময় এই কাজ করতেন যখন একজন একা মহিলা চালককে সমাজ সহজে গ্রহণ করত না।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই সময়ের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন—কখনও খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত, নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে লঙ্কার গুঁড়ো রাখতেন এবং ঘুমানোর জন্য অটোর মধ্যেও রাত কাটাতে হয়েছে।
এই ঘটনাগুলি তাঁর সংগ্রামের বাস্তবতা বোঝায়।
এটি কোনও রূপকথার সাফল্যের গল্প ছিল না।
প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের মধ্য দিয়েই তাঁর পথ তৈরি হয়েছিল।
শুধু অটো নয়
শীলার কর্মজীবন অটো-রিকশাতেই থেমে থাকেনি।
তিনি পরে ম্যাটাডোর এবং স্কুল বাসও চালিয়েছেন।
১৯৮৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর তিনি বিভিন্ন ধরনের যান চালানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ তাঁর কাছে গাড়ি চালানো শুধু একটি বিশেষ গাড়ির সঙ্গে যুক্ত পেশা ছিল না।
ড্রাইভিং ছিল তাঁর দক্ষতা।
আর সেই দক্ষতাকে তিনি নিজের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও নতুন দায়িত্ব
১৯৯১ সালে শীলা শিরীষ কাম্বলেকে বিয়ে করেন।
তিনিও অটোচালক ছিলেন।
পরিবার গড়ার পাশাপাশি শীলা নিজের কর্মজীবনও চালিয়ে যান।
১৯৯৪ সালে তাঁদের প্রথম কন্যার জন্ম হয়।
পরে ২০০১ সালে দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়।
একদিকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাজ, অন্যদিকে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব—দুটি দিক সামলাতে তাঁকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, একসময় দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার পর বাড়ি ফিরে ঘরের কাজও সামলাতে হতো।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের আরেকটি বাস্তব দিক তুলে ধরে—পেশাগত স্বাধীনতার পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্বও অনেক মহিলার জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
কেন গাড়ি চালানোই পেশা?
শীলার ক্ষেত্রে ড্রাইভিং শুধু অর্থ উপার্জনের পথ ছিল না।
এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি অংশ।
শৈশব থেকেই গাড়ি চালানোর প্রতি আগ্রহ তাঁকে এই পেশায় নিয়ে এসেছিল।
তিনি সমাজের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের ইচ্ছাকেই পেশায় পরিণত করেন।
এই সিদ্ধান্তের মধ্যে আত্মনির্ভরতার একটি শক্তিশালী দিক ছিল।
কারণ নিজের পেশা নিজে বেছে নেওয়ার ক্ষমতাও ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৩ বছরের অভিজ্ঞতা
প্রায় ১৩ বছর ধরে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন চালক হিসেবে নয়, একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও তৈরি করে।
পরবর্তীকালে তিনি তাঁর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে পরিবহন ব্যবসার দিকে এগিয়ে যান।
বিভিন্ন সূত্রে তাঁদের ব্যবসা ও পরবর্তী Vighnaharta Tourism-এর সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ যে মেয়ে একদিন মাত্র ১২ টাকা নিয়ে পুনে এসেছিলেন, তাঁর কর্মজীবন ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো থেকে ব্যবসার জগতেও বিস্তৃত হয়।
শরীরের সীমাবদ্ধতা এলেও পথ থামেনি
দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর শীলা একদিকে সংসার সামলানোর সমস্যার মুখোমুখি হন, অন্যদিকে কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আগের মতো দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে ধীরে ধীরে তাঁর সরাসরি ড্রাইভিংয়ের কাজ কমে আসে।
কিন্তু কাজের ধরন বদলানো মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়।
তিনি পরিবহন ব্যবসা এবং অন্যান্য উদ্যোগের দিকে মন দেন।
এই পরিবর্তনও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—পরিস্থিতি বদলালে কাজের পদ্ধতিও বদলাতে হয়।
‘First Ladies’ সম্মান
শীলার পথচলা পরবর্তীকালে আরও বড় স্বীকৃতি পায়।
ভারতের রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তাঁকে First Ladies Award-এর সম্মান দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও সামনে আসে।
কারণ তিনি এমন একটি পেশায় প্রথম দিকের মহিলা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন, যেখানে নারীদের প্রবেশ তখন অত্যন্ত সীমিত ছিল।
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ
শীলা দাওরের আগে কোনও মেয়ের অটো চালানো ছিল বিরল।
তাঁর পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
আজ ভারতের বিভিন্ন শহরে মহিলা অটোচালক দেখা যায়।
অবশ্য এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু একজন ব্যক্তির অবদান নয়—অসংখ্য নারী নিজেদের শ্রম দিয়ে এই পেশায় জায়গা তৈরি করেছেন।
তবু পথিকৃৎদের ভূমিকা আলাদা।
প্রথম মানুষটি যখন কোনও বন্ধ দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন, তখন পরের মানুষগুলির জন্য সেই দরজাটি আর আগের মতো অচেনা থাকে না।
শীলা দাওরের গল্পের গুরুত্ব এখানেই।
একটি স্টিয়ারিং, একটি সিদ্ধান্ত
শীলার জীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জীবন বদলানোর জন্য সবসময় বিশাল সম্পদ দরকার হয় না।
কখনও একটি দক্ষতা, একটি সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ানোর সাহসই যথেষ্ট হতে পারে।
১৮ বছর বয়সে ১২ টাকা নিয়ে পুনে আসা একটি মেয়ে জানতেন না তাঁর নাম একদিন রেকর্ড বইয়ে লেখা হবে।
তিনি শুধু জানতেন, তিনি গাড়ি চালাতে চান এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান।
সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তই পরে তাঁর জীবনের পরিচয় হয়ে ওঠে।
উপসংহার
শীলা দাওরের গল্প কোনও সিনেমার কল্পিত চরিত্রের গল্প নয়।
এটি একজন বাস্তব নারীর দীর্ঘ পরিশ্রমের ইতিহাস।
যে সময়ে অটো-রিকশার স্টিয়ারিং প্রায় সম্পূর্ণ পুরুষদের হাতে ছিল, সেই সময় তিনি নিজের জন্য সেই আসনটি তৈরি করেছিলেন।
তিনি পরিবার ছেড়েছেন, নতুন শহরে গিয়েছেন, কাজ খুঁজেছেন, প্রত্যাখ্যান সহ্য করেছেন, অটো চালিয়েছেন, টাকা সঞ্চয় করেছেন এবং নিজের গাড়ি কিনেছেন।
পরবর্তীকালে তাঁর নাম রেকর্ড বইয়ে উঠেছে, তিনি সম্মান পেয়েছেন এবং পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনও রেকর্ড বা পুরস্কার নয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি এমন একটি রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন, যে রাস্তায় তাঁর আগে খুব কম নারী হাঁটতেন।
আজ যখন কোনও মহিলা অটো-রিকশার স্টিয়ারিং হাতে যাত্রীকে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দেন, তখন সেই দৃশ্য আমাদের কাছে স্বাভাবিক।
কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে বহু নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম।
শীলা দাওরে তাঁদের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ।
স্টিয়ারিং শুধু একটি গাড়িকে চালায় না—কখনও কখনও একটি স্টিয়ারিং একটি সামাজিক ধারণাকেও ঘুরিয়ে দেয়। শীলা দাওরের জীবন তারই এক বাস্তব উদাহরণ।













Leave a Reply