
শহরের এক পুরোনো আবাসিক ভবনের নিচতলায় ছিল একটি ছোট্ট যন্ত্রপাতি মেরামতের দোকান। দোকানটির মালিক ছিলেন প্রবীর দত্ত। তালা, দরজার হাতল, জানালার ছিটকিনি কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া লক—এসব মেরামত করেই তাঁর সংসার চলত। তিনি কাজ করতেন ধীরে, কিন্তু কোনও জিনিস মেরামত না করে সহজে নতুন জিনিস কেনার পরামর্শ দিতেন না।
একদিন দুপুরে দোকানে এলেন ভবনের বাসিন্দা মধুমিতা। তাঁর হাতে ছিল একটি অদ্ভুত দরজার তালা।
“কাকু, এই তালাটা খুলছে না। দরজাটি ভেতর থেকে খোলা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে চাবি দিলেও খুলছে না। কাল থেকে আমাদের বাড়িতে অতিথি আসবেন। তার আগে ঠিক করা দরকার।”
প্রবীর তালাটি পরীক্ষা করে দেখলেন। যন্ত্রের ভেতরে একটি ছোট অংশ বেঁকে গিয়েছিল। তিনি বললেন, “এটা ঠিক করা সম্ভব। তবে তালাটি কেন এমন হয়েছে, সেটা বুঝতে হবে।”
মধুমিতা অবাক হয়ে বললেন, “তালা আবার নিজে থেকে এমন হবে কেন?”
প্রবীর হেসে বললেন, “যন্ত্রেরও ইতিহাস থাকে। কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, কোথায় চাপ পড়েছে, সবকিছুর ছাপ তার মধ্যে থেকে যায়।”
তিনি তালাটি খুলে পরিষ্কার করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, ভেতরের একটি স্প্রিং ভুলভাবে বসানো হয়েছে। হয়তো আগের কোনও মেরামতির সময় সেটি ঠিকমতো লাগানো হয়নি। প্রবীর স্প্রিংটি যথাস্থানে বসিয়ে তালাটি পরীক্ষা করলেন। এবার সেটি ঠিকভাবে কাজ করল।
মধুমিতা টাকা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, “আপনার কাছে সবাই তালা নিয়ে আসে। নিশ্চয়ই কত গোপন কথাও শুনতে পান!”
প্রবীরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল না, কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন, “মানুষের বাড়ির দরজা ঠিক করা আমার কাজ। তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দরজা খুলে দেখা আমার কাজ নয়।”
মধুমিতা কথাটি শুনে একটু থমকে গেলেন। তারপর মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
কয়েক দিন পর দোকানে এল এক যুবক। নাম অয়ন। সে প্রবীরকে একটি ইলেকট্রনিক লক দেখিয়ে বলল, “এটি এমনভাবে বদলে দিতে হবে, যাতে বাড়ির অন্য কেউ বুঝতে না পারে আমি কখন ঢুকছি বা বেরোচ্ছি।”
প্রবীর জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন?”
অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল, “সেটা আপনাকে বলতে হবে কেন? আমি টাকা দেব, আপনি কাজ করবেন।”
প্রবীর লকটি হাতে নিয়ে দেখলেন। যন্ত্রটির নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিবর্তন করে অন্য বাসিন্দাদের অজান্তে প্রবেশের সুবিধা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তিনি বুঝলেন, কাজটি শুধু মেরামতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে অন্য মানুষের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
তিনি শান্তভাবে বললেন, “যদি লকটি নষ্ট হয়ে থাকে, আমি সেটি মেরামত করতে পারি। কিন্তু অন্য বাসিন্দাদের অজান্তে প্রবেশের ব্যবস্থা তৈরি করে দিতে পারব না।”
অয়ন রেগে গেল। “আপনি কি আমাকে চোর ভাবছেন?”
প্রবীর উত্তর দিলেন, “আমি আপনাকে কিছু ভাবছি না। আমি শুধু এমন কাজ করি না, যাতে কারও নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে।”
অয়ন লকটি নিয়ে চলে গেল।
সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার সময় প্রবীর দেখলেন, পাশের ভবনের নিরাপত্তারক্ষী বিমল তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। বিমল জানালেন, কয়েক দিন ধরে ভবনের একটি ফাঁকা ফ্ল্যাটে অচেনা মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ অনুমান করছেন, ভবনেরই কোনও বাসিন্দা হয়তো অন্যদের অনুপস্থিতিতে সেখানে ঢুকছেন।
প্রবীর মন দিয়ে কথা শুনলেন। তিনি জানতেন, অনুমানকে প্রমাণ বলে চালানো উচিত নয়। তাই কাউকে সন্দেহ না করে তিনি বিমলকে বললেন, ভবনের ব্যবস্থাপনা কমিটিকে জানাতে এবং প্রয়োজন হলে আইনসম্মতভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করাতে।
পরদিন কমিটির সদস্যরা প্রবীরের দোকানে এলেন। তাঁরা জানতে চাইলেন, কোনও লক বাইরে থেকে খোলা হয়েছে কি না, কিংবা কেউ বিশেষ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করছে কি না।
প্রবীর বললেন, “আমি নির্দিষ্ট কোনও দরজা পরীক্ষা না করে কিছু বলতে পারব না। আর কারও ব্যক্তিগত তথ্য বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিবরণ অনুমতি ছাড়া আলোচনা করাও ঠিক নয়।”
কমিটির সদস্যরা প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও পরে তাঁর কথার যুক্তি বুঝলেন। তাঁরা ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করার জন্য অনুমোদিত বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিলেন। দেখা গেল, একটি পুরোনো দরজার লক ক্ষতিগ্রস্ত ছিল এবং আরেকটি দরজার স্বয়ংক্রিয় বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছিল না। সেই ত্রুটির সুযোগে অননুমোদিত প্রবেশ সম্ভব হতে পারত।
সমস্যাগুলো মেরামত করা হলো। ভবনের বাসিন্দাদেরও জানানো হলো, দরজা ঠিকভাবে বন্ধ হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করতে এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে নিজে থেকে কাউকে অভিযুক্ত না করে কর্তৃপক্ষকে জানাতে।
কয়েক দিন পর অয়ন আবার প্রবীরের দোকানে এল। এবার তার হাতে ছিল একটি সাধারণ দরজার হাতল।
সে নিচু গলায় বলল, “সেদিন আপনার ওপর রাগ করেছিলাম। পরে বুঝেছি, আমি যে কাজটা চেয়েছিলাম, তাতে অন্যদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারত। আসলে বাড়িতে আমার পরিবারের সঙ্গে কিছু সমস্যা চলছে। আমি ভেবেছিলাম, কাউকে না জানিয়ে আসা-যাওয়া করলেই সব মিটে যাবে।”
প্রবীর মন দিয়ে তার কথা শুনলেন। তিনি ব্যক্তিগত সমস্যার খুঁটিনাটি জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন, “সব সমস্যার সমাধান তালা বদলে হয় না। কখনও কথা বলতে হয়, কখনও নিরপেক্ষ কারও সাহায্য নিতে হয়। আর যদি বাড়িতে নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকে, তাহলে উপযুক্ত সাহায্য নেওয়া জরুরি।”
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আপনি কি মনে করেন, মানুষ বদলাতে পারে?”
প্রবীর হাতলটি মেরামত করতে করতে বললেন, “যন্ত্রের ক্ষত সারানো যায়, মানুষের ভুলও শুধরে নেওয়া যায়। তবে তার জন্য ভুলটা স্বীকার করতে হয়।”
অয়ন আর কোনও কথা বলল না। টাকা দিয়ে সে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। তার সমস্যার সমাধান সেদিনই হয়নি, কিন্তু সে প্রথমবার বুঝেছিল—গোপনীয়তা আর অন্যের নিরাপত্তা ভাঙার মধ্যে পার্থক্য আছে।
বছর শেষে প্রবীরের দোকানে একটি ছোট ফলক লাগানো হলো। সেখানে লেখা ছিল—
“তালা মেরামত করি, মানুষের বিশ্বাস নয়।”
দোকানে আসা অনেকেই বাক্যটি পড়ে হাসতেন। কিন্তু প্রবীরের কাছে এর অর্থ ছিল গভীর। তাঁর কাজ শুধু যন্ত্র সচল করা নয়; নিজের দক্ষতা যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়, সেই দায়িত্বও তাঁর।
তিনি প্রতিদিনের মতো তালা, হাতল আর ছিটকিনি মেরামত করতে থাকলেন। কোনও দরজা আটকে গেলে সেটি খোলার উপায় খুঁজতেন, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করতেন না।
কারণ তিনি জানতেন, বাড়ির দরজা বন্ধ থাকলে কখনও তা খুলতে সাহায্য করতে হয়; আবার কখনও সেই বন্ধ দরজাটিকে সম্মান করাই সবচেয়ে বড় সততা।
শিক্ষা: দক্ষতা তখনই মূল্যবান, যখন তা দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। অন্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে সম্মান করা দুর্বলতা নয়; এটি সততা এবং মানবিকতার পরিচয়।












Leave a Reply