গল্প : যে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ছিল তিনটি জীবনের গল্প।।

গ্রামের নাম শালবনি। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া লাল মাটির রাস্তা আর রাস্তার দু’পাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাড়ি। সেই গ্রামের এক প্রান্তে থাকতেন সত্তরোর্ধ্ব সরলা দেবী। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একাই থাকতেন। তাঁর সংসারে আর কেউ ছিল না। তবে একসময় তাঁর বাড়ি ছিল হাসি, গল্প আর মানুষের আনাগোনায় ভরা।

সরলা দেবীর স্বামী ছিলেন তাঁতশিল্পী। নিজের হাতে নকশা করা কাপড় বুনতেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে অরুণ ছোটবেলায় বাবার কাজ শিখেছিল। কিন্তু বড় হয়ে সে শহরে চলে যায়। সেখানে চাকরি পেয়ে সংসার শুরু করে। প্রথমদিকে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফোনের সংখ্যা কমতে থাকে। ব্যস্ততা, সংসারের দায়িত্ব আর দূরত্ব মিলিয়ে গ্রামের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা ক্রমশ আলগা হয়ে যায়।

সরলা দেবী অবশ্য কাউকে দোষ দিতেন না। তিনি জানতেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন বদলায়। তবু প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

একদিন সেই গ্রামে এল কলেজপড়ুয়া মেয়ে মেঘলা। সে সরলা দেবীর প্রতিবেশী বাড়িতে ভাড়া থাকত। পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের মহিলাদের নিয়ে একটি ছোট স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাজ করছিল। গ্রামের মহিলারা কীভাবে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উপার্জন করতে পারেন, সেই বিষয়েই তার আগ্রহ।

এক বিকেলে মেঘলা দেখল, সরলা দেবী উঠোনে বসে একটি পুরোনো কাপড়ের ছেঁড়া অংশে সূক্ষ্ম নকশা তুলছেন।

মেঘলা কাছে গিয়ে বলল, “ঠাকুমা, কী বানাচ্ছ?”

সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন, “কিছু না রে মা। পুরোনো দিনের অভ্যাস। হাতটা অবসর পেলেই সুতো খুঁজতে থাকে।”

মেঘলা কাপড়টি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল। এত সুন্দর নকশা সে আগে দেখেনি।

“তুমি কি এসব কাজ কাউকে শেখাও?”

“শেখাব কাকে? এখন আর এসবের কদর কোথায়? সবাই তো কারখানার তৈরি জিনিস কেনে।”

মেঘলা কথাটা শুনে চুপ করে গেল। তার মনে হলো, এই হাতের কাজ শুধু একটি পুরোনো অভ্যাস নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক মূল্যবান শিল্প।

পরের দিন সে আবার এল। সঙ্গে নিয়ে এল গ্রামের আরও দু’জন মহিলাকে। সরলা দেবীর কাছে তারা নকশা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করল।

প্রথমে সরলা দেবী রাজি হলেন না। বললেন, “আমার বয়স হয়েছে। এত কিছু আর পারব না।”

মেঘলা উত্তর দিল, “তোমাকে সব করতে হবে না। শুধু আমাদের শিখিয়ে দাও। তোমার শেখানো কাজগুলোই একদিন অন্যদের জীবনে কাজে লাগবে।”

কথাগুলো সরলা দেবীর মনে দাগ কাটল।

সেদিন থেকে শুরু হলো নতুন এক যাত্রা। প্রতিদিন বিকেলে সরলা দেবীর উঠোনে কয়েকজন মহিলা জড়ো হতে লাগলেন। কেউ সুতো গুছিয়ে দিতেন, কেউ কাপড়ে নকশা তুলতেন, কেউ আবার নতুন নকশা তৈরি করার চেষ্টা করতেন।

সরলা দেবী ধৈর্য ধরে সবাইকে শেখাতেন। ভুল হলে বকতেন না। বরং বলতেন, “সুতো একবার ছিঁড়ে গেলে তাকে জোড়া দিতে হয়। মানুষের জীবনও ঠিক তেমন। ভুল হলে থেমে যাওয়া নয়, আবার শুরু করতে হয়।”

এই কথাটা মেঘলার খুব ভালো লাগত।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মহিলারা ছোট ছোট ব্যাগ, টেবিলের ঢাকা, শাড়ির পাড় এবং নকশা করা রুমাল তৈরি করতে শিখে গেলেন। মেঘলা তাদের তৈরি জিনিসের ছবি তুলে অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করল।

প্রথমে অর্ডার এল খুব কম। কিন্তু একদিন কলকাতার একটি হস্তশিল্পের দোকান থেকে বড় অর্ডার এল। গ্রামের মহিলারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।

কেউ বললেন, “এতদিন মনে হতো আমাদের হাতে কিছু করার নেই। এখন বুঝছি, আমাদের হাতেই তো কত কিছু আছে!”

সরলা দেবী সবার আনন্দ দেখে হাসলেন। কিন্তু তাঁর মনে কোথাও একটা শূন্যতা রয়ে গেল। তাঁর ছেলে অরুণ যদি একবার এসে এই কাজগুলো দেখত!

মেঘলা একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, তোমার ছেলে কি জানে তুমি আবার কাজ শুরু করেছ?”

সরলা দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জানে না। অনেকদিন কথা হয়নি। ওর নিজের সংসার আছে। আমার জন্য ওকে চিন্তা করতে হবে, এমনটা চাই না।”

মেঘলা আর কিছু বলল না।

কয়েকদিন পর মেঘলা সরলা দেবীর অনুমতি নিয়ে তাঁর তৈরি নকশার কয়েকটি ছবি ও কাজের গল্প সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করল। পোস্টটির সঙ্গে সে লিখেছিল, কীভাবে এক বৃদ্ধা নারী নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে গ্রামের কয়েকজন মহিলার সামনে নতুন পথ খুলে দিয়েছেন।

পোস্টটি বেশ জনপ্রিয় হলো। অনেকেই প্রশংসা করলেন। একজন মন্তব্য করলেন, “এমন শিল্পীদের কাজ সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।”

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল অন্য জায়গায়।

শহরে বসে অরুণ একদিন সামাজিক মাধ্যমে মায়ের ছবি দেখতে পেল। ছবিতে মায়ের হাতে সুতো, পাশে কয়েকজন মহিলা, আর মুখে সেই পুরোনো পরিচিত হাসি।

অরুণ অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে তাঁতের সামনে বসে সুতো গুছিয়ে দিত সে। বাবা বলতেন, “কাপড় শুধু সুতো দিয়ে তৈরি হয় না। এর মধ্যে থাকে সময়, ধৈর্য আর মানুষের ভালোবাসা।”

বাবার মৃত্যুর পর সেই কথাগুলো সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।

অরুণ সেদিনই মাকে ফোন করল।

“মা, কেমন আছ?”

ফোনের ওপার থেকে সরলা দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ভালো আছি বাবা। তুই কেমন আছিস?”

“তোমার কাজের ছবি দেখলাম। তুমি তো আবার আগের মতো কাজ শুরু করেছ!”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “হ্যাঁ রে। কয়েকটা মেয়ে শিখতে এসেছে। ওদের সঙ্গে সময় ভালো কাটে।”

অরুণ বলল, “মা, আমি খুব শিগগিরই বাড়ি আসব।”

সরলা দেবী কিছু বললেন না। শুধু ফোনটা কানে ধরে চোখ মুছলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর অরুণ সত্যিই গ্রামে এল। সঙ্গে নিয়ে এল নিজের স্ত্রী ও ছোট মেয়ে তিয়াশাকে। বাড়িতে ঢুকেই সে দেখল, উঠোনে কয়েকজন মহিলা কাজ করছেন। মা তাঁদের নকশা বোঝাচ্ছেন।

অরুণ মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“মা!”

সরলা দেবী মুখ তুলে ছেলেকে দেখে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “তুই এসেছিস বাবা?”

অরুণ মায়ের হাত ধরে বলল, “এতদিন তোমার খবর ঠিকমতো নিইনি। নিজের ব্যস্ততাকে অজুহাত বানিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো।”

সরলা দেবী ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হয় না। শুধু মাঝে মাঝে খবর নিস। তাহলেই হবে।”

তিয়াশা তখন দাদির পাশে বসে সুতো নিয়ে খেলছিল। সে হঠাৎ বলল, “দিদা, আমাকেও শেখাবে?”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “অবশ্যই শেখাব। তবে সুতো নিয়ে খেললে চলবে না, যত্ন করে কাজ করতে হবে।”

অরুণও মায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে শহরে কাজ করার পাশাপাশি অনলাইনে তাঁদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য একটি সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি করে দিল। পণ্যের ছবি, দাম, অর্ডার নেওয়া—সবকিছুতেই সে সাহায্য করতে লাগল।

মেঘলা ও গ্রামের মহিলারা নতুন উৎসাহ পেলেন। তাঁদের উদ্যোগের নাম রাখা হলো ‘সরলার সুতো’। নামটি শুনে সরলা দেবীর চোখ ভিজে উঠল।

একদিন সন্ধ্যায় উঠোনে সবাই বসেছিল। সরলা দেবী একটি নতুন নকশা করা কাপড় হাতে নিয়ে বললেন, “জানো, একটা কাপড় তৈরি করতে কতগুলো সুতো লাগে? কোনো সুতো একা কাপড় বানাতে পারে না। প্রতিটি সুতোকে অন্য সুতোর সঙ্গে জুড়তে হয়। তবেই তৈরি হয় সুন্দর নকশা।”

মেঘলা বলল, “মানুষের জীবনও কি তাই নয় ঠাকুমা?”

সরলা দেবী মাথা নাড়লেন।

“ঠিক তাই। একজনের অভিজ্ঞতা, আরেকজনের স্বপ্ন, কারও পরিশ্রম, কারও ভালোবাসা—সব মিলিয়েই একটা সুন্দর সমাজ তৈরি হয়।”

সেদিন অরুণ বুঝতে পারল, মায়ের কাছে ফিরে আসা শুধু নিজের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানো নয়। সে ফিরে পেয়েছে নিজের শিকড়কেও।

কয়েক মাসের মধ্যে ‘সরলার সুতো’ গ্রামের পরিচিত একটি উদ্যোগ হয়ে উঠল। গ্রামের মহিলারা নিয়মিত উপার্জন করতে লাগলেন। মেঘলা তার পড়াশোনা শেষ করে এই কাজকে আরও বড় করার পরিকল্পনা করল। আর তিয়াশা স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন দাদির কাছে নতুন নকশা শিখতে বসত।

সরলা দেবীর বাড়ির উঠোনে এখন আর একাকিত্ব নেই। সেখানে আছে হাসি, গল্প, কাজের শব্দ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

একদিন মেঘলা সরলা দেবীকে জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, তুমি কি ভাবতে পেরেছিলে তোমার পুরোনো কাজ একদিন এত মানুষের জীবন বদলে দেবে?”

সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন, “আমি তো শুধু সুতো বুনতে জানতাম মা। কে জানত, সেই সুতো একদিন মানুষকেও কাছে টেনে আনবে!”

জীবনে অনেক সম্পর্ক দূরত্বের কারণে আলগা হয়ে যায়। অনেক প্রতিভা অবহেলায় হারিয়ে যায়। কিন্তু আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস থাকলে সেই সম্পর্ক ও প্রতিভা আবার নতুন করে জেগে উঠতে পারে।

শিক্ষণীয় কথা: মানুষের জীবনে কোনো অভিজ্ঞতাই মূল্যহীন নয়। পুরোনো দিনের দক্ষতা নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দিলে তা শুধু ঐতিহ্য রক্ষা করে না, মানুষের জীবনে আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার পথও খুলে দেয়। আর সম্পর্কের বন্ধনকে বাঁচিয়ে রাখতে বড় কোনো উপহারের প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন একটু সময়, সামান্য খোঁজখবর এবং আন্তরিক ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *