নেতৃত্ব মানে সবার উপরে থাকা নয়, সবার পাশে দাঁড়ানো: আদর্শ নেতৃত্বের নৈতিক পাঠ।

একটি পরিবার, বিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। কোথাও একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পথ দেখান, কোথাও একজন অভিভাবক পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব সামলান, আবার কোথাও একজন প্রশাসক বা জনপ্রতিনিধি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ কি শুধু নির্দেশ দেওয়া, ক্ষমতা প্রয়োগ করা কিংবা অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করা?

নিশ্চয়ই নয়। প্রকৃত নেতৃত্বের অর্থ হলো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, সবার কথা শোনা, প্রয়োজনে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া এবং অন্যদের উন্নতির সুযোগ তৈরি করা। যে ব্যক্তি শুধু নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চান, তিনি হয়তো ক্ষমতাবান হতে পারেন, কিন্তু আদর্শ নেতা হয়ে উঠতে পারেন না।

নৈতিক শিক্ষা আমাদের শেখায়, নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত গৌরবের আসন নয়; এটি একটি বড় দায়িত্ব। একজন প্রকৃত নেতা নিজের স্বার্থের চেয়ে দলের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি সাফল্যের কৃতিত্ব সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন এবং ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যান না। তাঁর কাছে নেতৃত্ব মানে আধিপত্য নয়, বরং সেবা, সহযোগিতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় কোথায়?

সমাজে অনেক সময় পদমর্যাদা ও নেতৃত্বকে একই বিষয় বলে মনে করা হয়। কেউ উচ্চপদে রয়েছেন বলেই তাঁকে নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পদ থাকলেই নেতৃত্বের গুণ তৈরি হয় না।

একজন ব্যক্তি পদ ছাড়াও মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন। আবার কেউ বড় পদে থেকেও মানুষের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হতে পারেন।

প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় প্রকাশ পায় আচরণে। একজন নেতা অন্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন, তাঁদের সমস্যাকে কতটা গুরুত্ব দেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কতটা ন্যায়সংগত থাকেন এবং কঠিন পরিস্থিতিতে কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন—এসব বিষয়ই তাঁর নেতৃত্বের মান নির্ধারণ করে।

যিনি অন্যদের ভয় দেখিয়ে কাজ করান, তিনি হয়তো সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু যিনি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্মানের মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করেন, তাঁর নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়।

নেতা হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়া জরুরি

নেতৃত্বের ভিত্তি হলো চরিত্র। একজন মানুষের মধ্যে সততা, বিনয়, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীলতা না থাকলে তাঁর পক্ষে আদর্শ নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন।

যিনি নিজের স্বার্থে মিথ্যা বলেন, অন্যের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেন কিংবা নিজের ভুল ঢাকতে অধস্তনদের দোষারোপ করেন, তিনি কখনোই মানুষের প্রকৃত আস্থা অর্জন করতে পারবেন না।

একজন ভালো নেতাকে প্রথমে নিজের আচরণের দিকে নজর দিতে হয়। তিনি যা অন্যদের করতে বলেন, নিজের জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

যদি একজন নেতা সময়ানুবর্তিতার কথা বলেন, অথচ নিজেই নিয়মিত দেরি করেন, তাহলে তাঁর কথার গুরুত্ব কমে যায়। যদি তিনি সততার শিক্ষা দেন, অথচ নিজে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁর নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।

তাই নেতৃত্বের প্রথম শর্ত হলো নিজের জীবনকে আদর্শ আচরণের মাধ্যমে পরিচালিত করা।

নির্দেশ দেওয়ার আগে মানুষের কথা শুনুন

অনেকেই নেতৃত্ব বলতে শুধু নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাকে বোঝেন। তাঁরা মনে করেন, একজন নেতা কথা বলবেন এবং অন্যরা তা মেনে চলবেন। কিন্তু প্রকৃত নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা।

একটি দলের প্রত্যেক সদস্যের অভিজ্ঞতা, মতামত এবং সমস্যা আলাদা হতে পারে। নেতা যদি শুধু নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তাহলে দলের অন্য সদস্যরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

অন্যদিকে যিনি সবার কথা শোনেন, যুক্তি বিবেচনা করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন, তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেন।

কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সমস্যা শোনা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা বোঝা কিংবা পরিবারে প্রত্যেক সদস্যের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এসবই নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

শোনা মানে সব মতামত মেনে নেওয়া নয়। বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মানুষের অবস্থান বোঝার আন্তরিক চেষ্টা করা।

ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই নেতৃত্বের আসল ভিত্তি

নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতা যুক্ত থাকলেও ক্ষমতাই নেতৃত্বের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। একজন নেতার হাতে যে ক্ষমতা থাকে, তা মূলত একটি দায়িত্ব পালনের উপায়।

যে ব্যক্তি নিজের পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেন, অন্যদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করেন কিংবা নিজের বিরোধীদের প্রতি অন্যায় আচরণ করেন, তিনি নেতৃত্বের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করেন।

অন্যদিকে আদর্শ নেতা ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু নিজের জীবনে নয়, অনেক মানুষের জীবনেও পড়তে পারে।

তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি। সিদ্ধান্তটি কি সবার জন্য ন্যায্য? এতে দুর্বল বা কম ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কি না? কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে অযথা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্ন একজন নৈতিক নেতাকে নিজের কাছে রাখতে হয়।

সাফল্যের কৃতিত্ব ভাগ করে নেওয়ার মহত্ত্ব

একটি দল বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সাধারণত একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় আসে না। এর পেছনে অনেক মানুষের পরিশ্রম, পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং ত্যাগ থাকে।

কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায়, কোনো কাজ সফল হলে নেতা সমস্ত কৃতিত্ব নিজের নামে নিতে চান। অথচ কাজটি ব্যর্থ হলে দায় চাপিয়ে দেন অন্যদের ওপর।

এই আচরণ নেতৃত্বের দুর্বলতার পরিচয়।

প্রকৃত নেতা জানেন, সাফল্য দলগত প্রচেষ্টার ফল। তাই তিনি প্রত্যেক সদস্যের অবদানকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেন। কেউ ছোট দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর কাজের গুরুত্ব বোঝেন।

একজন কর্মী হয়তো পর্দার আড়ালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। একজন শিক্ষক হয়তো শিক্ষার্থীদের সাফল্যের জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। একজন সংগঠক হয়তো প্রচারের আলোয় না এসেও একটি অনুষ্ঠান সফল করতে বড় ভূমিকা নিয়েছেন।

আদর্শ নেতা তাঁদের অবদান ভুলে যান না। তিনি জানেন, প্রত্যেকের কাজের মর্যাদা রক্ষা করলেই একটি দল শক্তিশালী হয়।

ব্যর্থতার সময় দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা সাফল্যের সময় নয়, সংকটের সময়। যখন সবকিছু পরিকল্পনামতো চলে, তখন নেতৃত্ব দেওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু কোনো ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সমস্যা তৈরি হলে, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা দলের সদস্যরা বিপদে পড়লে নেতার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়।

কেউ কেউ সংকটের সময় দায়িত্ব এড়িয়ে যান। তাঁরা অন্যদের দোষারোপ করেন, সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন কিংবা নিজের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

কিন্তু একজন আদর্শ নেতা পরিস্থিতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কোথায় ভুল হয়েছে তা খুঁজে বের করেন, প্রয়োজন হলে ক্ষমা চান এবং সংশোধনের ব্যবস্থা করেন।

দায়িত্ব নেওয়া মানে সব ভুল নিজের ওপর চাপিয়ে নেওয়া নয়। বরং একজন নেতা হিসেবে নিজের ভূমিকা স্বীকার করা এবং সমস্যার সমাধানে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসা।

এই মানসিকতাই মানুষের মনে নেতার প্রতি বিশ্বাস তৈরি করে।

দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো

একজন নেতার নৈতিকতার বড় পরীক্ষা হলো তিনি সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন।

যাঁদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী, যাঁরা সহজে নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল, যাঁদের সামাজিক প্রভাব কম কিংবা যাঁরা নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে পারেন না, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রকৃত মানবিকতা প্রয়োজন।

একজন আদর্শ নেতা সবার জন্য সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। তিনি শুধু প্রভাবশালী মানুষের কথা শোনেন না। বরং যাঁদের কথা সাধারণত উপেক্ষিত হয়, তাঁদের সমস্যাকেও গুরুত্ব দেন।

বিদ্যালয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করা, কর্মক্ষেত্রে নতুন কর্মীদের শেখার সুযোগ দেওয়া কিংবা সমাজে অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া—এসবই নেতৃত্বের মানবিক রূপ।

নেতৃত্ব তখনই সার্থক হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়।

আদর্শ নেতা ভয় নয়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন

ভয়ের মাধ্যমে মানুষকে কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু ভয়ের পরিবেশে মানুষের সৃজনশীলতা, স্বাধীন চিন্তা এবং কাজের আগ্রহ কমে যায়।

যে নেতা সব সময় ধমক দেন, ভুলের জন্য অপমান করেন কিংবা প্রশ্ন করার সুযোগ দেন না, তাঁর অধীনে মানুষ নিজেদের সম্ভাবনা প্রকাশ করতে ভয় পায়।

অন্যদিকে একজন ভালো নেতা এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে দলের সদস্যরা নতুন ধারণা প্রকাশ করতে পারেন, ভুল হলে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন এবং নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান।

তিনি অন্যদের ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা তৈরি করেন না। বরং তাঁদের এমনভাবে গড়ে তোলেন, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।

প্রকৃত নেতার সাফল্য শুধু তাঁর নিজের দক্ষতায় নয়, তাঁর নেতৃত্বে কতজন মানুষ দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, তার মধ্যেও প্রকাশ পায়।

পরিবারে নেতৃত্বের নৈতিক শিক্ষা

নেতৃত্বের শিক্ষা শুধু রাষ্ট্র, রাজনীতি কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পরিবারেও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পরিবারের অভিভাবকরা অনেক সময় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁদের মনে রাখা দরকার, পরিবারের সদস্যদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই নেতৃত্ব নয়।

একটি সুস্থ পরিবারে প্রত্যেকের মতামত, অনুভূতি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সন্তানদের শুধু নির্দেশ না দিয়ে তাদের কথা শোনা, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা এবং কঠিন সময়ে সবাইকে একত্রিত রাখা—এসবই পারিবারিক নেতৃত্বের পরিচয়।

অভিভাবকরা যদি নিজের আচরণের মাধ্যমে সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ এবং সহমর্মিতার শিক্ষা দেন, তাহলে সন্তানরাও ভবিষ্যতে ভালো নেতৃত্বের গুণ অর্জন করতে পারে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষকের নেতৃত্ব

একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান প্রদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে নয়, বরং আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে শিক্ষা দেন। তিনি মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদেরও গুরুত্ব দেন।

শিক্ষার্থীর ভুল হলে তাকে অপমান না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা রাখা এবং প্রত্যেকের মধ্যে ভালো গুণ খুঁজে বের করা শিক্ষকের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন শিক্ষক যদি ন্যায়সংগত আচরণ করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা শুধু তাঁর কাছ থেকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা নয়, জীবনের নৈতিক শিক্ষাও গ্রহণ করে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে নৈতিকতার প্রয়োজন

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু মানুষের জীবনে পড়তে পারে।

তাই তাঁদের কাছে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনকল্যাণের মানসিকতা থাকা জরুরি।

জনগণের সমর্থন পাওয়া মানে ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের অধিকার অর্জন করা নয়। বরং মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার দায়িত্ব গ্রহণ করা।

আদর্শ সামাজিক নেতা নিজের মতাদর্শের বাইরে থাকা মানুষের অধিকারকেও সম্মান করেন। বিরোধী মতকে শত্রুতা হিসেবে দেখেন না। সমালোচনাকে ব্যক্তিগত অপমান মনে না করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।

সমাজের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হয় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, ন্যায়বিচার এবং সামগ্রিক কল্যাণ।

নতুন নেতৃত্ব তৈরি করাও একজন নেতার দায়িত্ব

একজন প্রকৃত নেতা কখনো চান না যে তাঁর অনুপস্থিতিতে সব কাজ থেমে যাক। তিনি জানেন, কোনো ব্যক্তি চিরকাল একই পদে থাকবেন না। তাই তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হলো নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা।

নতুনদের কাজ শেখানো, দায়িত্ব দেওয়া, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের দক্ষতার বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে নেতা নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য অন্যদের এগিয়ে আসতে বাধা দেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করেন।

অন্যদিকে যিনি নতুন নেতৃত্ব তৈরি করেন, তিনি নিজের কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেন। তাঁর প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন তাঁর তৈরি করা মানুষরাও সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

আদর্শ নেতৃত্ব গড়ে তোলার কয়েকটি নৈতিক অভ্যাস

১. নিজের আচরণে সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা।

২. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত শোনা।

৩. ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দল বা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া।

৪. সাফল্যের কৃতিত্ব সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।

৫. ব্যর্থতার সময় দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং ভুল সংশোধন করা।

৬. দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা।

৭. ভয় দেখিয়ে নয়, বিশ্বাস ও সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষকে পরিচালিত করা।

৮. সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা।

৯. নতুন প্রজন্মকে দক্ষ ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা।

১০. পদমর্যাদার পরিবর্তে কাজ ও আচরণের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করা।

উপসংহার

নেতৃত্ব কোনো বিশেষ পদ, উপাধি কিংবা ক্ষমতার পরিচয়মাত্র নয়। এটি মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার একটি মানসিকতা। যে ব্যক্তি অন্যদের সম্মান করেন, তাঁদের কথা শোনেন, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান এবং নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবার কল্যাণের কথা ভাবেন, তিনিই প্রকৃত নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

নৈতিক শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নেতৃত্বের আসল শক্তি ভয় দেখানোর মধ্যে নয়, মানুষের বিশ্বাস অর্জনের মধ্যে। একজন নেতা যত বড় পদেই থাকুন না কেন, তাঁর আচরণে যদি বিনয়, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা না থাকে, তাহলে সেই নেতৃত্বের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাই আমাদের প্রত্যেকেরই নেতৃত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা সমাজে—যেখানেই দায়িত্ব পাওয়া যাক, সেখানে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একজন প্রকৃত নেতা সবার ওপরে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় প্রমাণ করেন না; তিনি অন্যদের হাত ধরে তাঁদেরও এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। কারণ নেতৃত্বের সর্বোচ্চ সার্থকতা নিজের চারপাশে অনুগত মানুষের ভিড় তৈরি করা নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ, নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *