গল্প : যে পুরোনো সেতুর ওপারে অপেক্ষা করছিল একটি নতুন সকাল।।

নদীটির নাম কংসাবতী। বর্ষায় তার জল ফুলে-ফেঁপে ওঠে, শীতকালে শান্ত হয়ে বয়ে চলে। নদীর দুই পাড়ে ছিল দুটি গ্রাম—উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়া। মাঝখানে নদী থাকলেও বহু বছর ধরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে ছিল গভীর যোগাযোগ। বিয়ে, উৎসব, বাজার, স্কুল—সবকিছুর জন্যই মানুষ এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত করত।

নদীর ওপর ছিল একটি পুরোনো লোহার সেতু। খুব বেশি চওড়া নয়, পাশাপাশি দুজন মানুষ হাঁটতে পারলেও সাইকেল নিয়ে চলতে গেলে সাবধানে যেতে হতো। সেতুটি তৈরি হয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। তখন সেটিই ছিল দুই গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেতুর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছিল। লোহার পাতগুলোতে মরচে ধরেছিল, কয়েকটি জায়গায় রেলিং ভেঙে গিয়েছিল। বৃষ্টির দিনে সেতুর ওপর পা রাখলে কেঁপে উঠত গোটা কাঠামো।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে একসময় সেতুতে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নিরাপত্তার কারণে সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলো।

দুই গ্রামের মানুষের জীবন যেন হঠাৎ থমকে গেল।

উত্তরপাড়ার স্কুলে পড়ত দক্ষিণপাড়ার অনেক শিশু। সেতু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের এখন নদীর অনেকটা ঘুরে অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে হতো। বর্ষাকালে সেই রাস্তার অবস্থাও ভালো থাকত না।

দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নির্মলবাবু। তিনি প্রায়ই বলতেন, “একটা সেতু ভেঙে গেলে শুধু রাস্তা বন্ধ হয় না, মানুষের সম্পর্কও দূরে সরে যায়।”

কিন্তু তাঁর কথা শোনার মতো লোক খুব বেশি ছিল না।

সেই গ্রামেই থাকত এক তরুণী, নাম ঐশী। সে কলেজে ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করছিল। ছোটবেলা থেকেই নদী, রাস্তা, গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে তার আগ্রহ ছিল।

সেতু বন্ধ হওয়ার পর সে লক্ষ করল, দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। উত্তরপাড়ার বাজারে দক্ষিণপাড়ার কৃষকেরা আর আগের মতো ফসল নিয়ে আসতে পারছেন না। স্কুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নিয়মিত দেরিতে পৌঁছচ্ছে। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে।

একদিন ঐশী তার দাদুকে বলল, “দাদু, সেতুটা আবার তৈরি করা যায় না?”

দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তৈরি করা তো যায় মা। কিন্তু তার জন্য পরিকল্পনা, অনুমতি আর অর্থ—সবকিছুর প্রয়োজন। শুধু ইচ্ছা থাকলেই হয় না।”

ঐশী বলল, “তাহলে আমরা অন্তত সমস্যাগুলো ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি।”

দাদু মৃদু হেসে বললেন, “সেটা পারলে ভালো হয়।”

ঐশী পরদিন থেকেই কাজ শুরু করল। সে দুই গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। কার কী সমস্যা হচ্ছে, কতটা পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, কোন সময়ে যাতায়াতের অসুবিধা সবচেয়ে বেশি—সব লিখে রাখল।

সে শুধু অভিযোগ সংগ্রহ করল না। সমস্যার বাস্তব প্রভাবও বোঝার চেষ্টা করল।

একদিন দক্ষিণপাড়ার কৃষক হরেনবাবু বললেন, “আগে ভোরে সবজি নিয়ে বাজারে যেতাম। এখন ঘুরপথে যেতে গিয়ে অনেক সময় লেগে যায়। ততক্ষণে বাজারের ভালো দাম পাওয়া যায় না।”

একজন স্কুলছাত্রী বলল, “বর্ষায় রাস্তা খারাপ থাকলে স্কুলে পৌঁছতে খুব ভয় লাগে। কখনও কখনও যেতে পারি না।”

ঐশী সব কথা লিখে নিল।

তারপর সে সেতুর বর্তমান অবস্থার ছবি তুলল। ভাঙা রেলিং, মরচে ধরা লোহার অংশ, ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগস্থল—সবকিছু আলাদা করে নথিবদ্ধ করল। তবে সে কাউকে সেতুর ওপর উঠতে বা ঝুঁকি নিয়ে ছবি তুলতে বলল না।

কলেজের এক অধ্যাপকের সাহায্যে সে বুঝতে পারল, পুরোনো সেতুটি মেরামত করা সম্ভব কি না, তা বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা ছাড়া বলা যাবে না। প্রয়োজনে নতুন সেতুর পরিকল্পনাও করতে হবে।

ঐশী তাই একটি প্রতিবেদন তৈরি করল। সেখানে দুই গ্রামের জনসংখ্যা, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের যাতায়াত, কৃষকদের বাজারে পৌঁছনোর সমস্যা এবং জরুরি চিকিৎসার অসুবিধা তুলে ধরা হলো।

প্রতিবেদনটি নিয়ে সে স্থানীয় পঞ্চায়েতের কাছে গেল।

প্রথম দিন খুব একটা সাড়া পেল না। একজন কর্মী বললেন, “এ ধরনের কাজ সময়সাপেক্ষ। এত সহজে কিছু হয় না।”

ঐশী শান্তভাবে বলল, “আমি জানি। কিন্তু সমস্যাটা তো প্রতিদিন বাড়ছে। অন্তত একটি সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটা জানালে ভালো হয়।”

কয়েকদিন পর সে এলাকার জনপ্রতিনিধি, পঞ্চায়েত সদস্য এবং দুই গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিল।

প্রথমে কেউ কেউ আপত্তি করলেন। তাঁদের বক্তব্য, এতদিন ধরে সেতুটি বন্ধ, এখন নতুন করে বৈঠক করে কী হবে?

ঐশী বলল, “আমরা যদি কথা না বলি, তাহলে সমস্যাটা শুধু আমাদের মধ্যেই থেকে যাবে। কিন্তু সবাই মিলে তথ্যসহ আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।”

শেষ পর্যন্ত বৈঠকের দিন ঠিক হলো।

সেদিন দুই গ্রামের অনেক মানুষ উপস্থিত হলেন। কৃষক, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, দোকানদার—সবার কথা শোনা হলো। ঐশী তার সংগ্রহ করা তথ্যগুলো তুলে ধরল।

নির্মলবাবু বললেন, “এই সেতু শুধু যাতায়াতের জন্য নয়। আমাদের গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, বাজার—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।”

বৈঠকের শেষে সিদ্ধান্ত হলো, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে যৌথভাবে আবেদন জানানো হবে এবং সেতুর নিরাপত্তা পরীক্ষা করার দাবি তোলা হবে।

কয়েক সপ্তাহ পর প্রকৌশল দপ্তরের একটি দল এল। তারা সেতুর অবস্থা পরীক্ষা করল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানানো হলো, পুরোনো কাঠামোটি নিরাপদ নয়। তাই সেটিকে আবার সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে না। নতুন সেতু নির্মাণের প্রস্তাব তৈরি করতে হবে।

খবরটি শুনে কেউ কেউ হতাশ হলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, পুরোনো সেতু মেরামত হলেই সমস্যার সমাধান হবে।

কিন্তু ঐশী বলল, “নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করে সেতু খুলে দেওয়া ঠিক হবে না। আমাদের লক্ষ্য শুধু পুরোনো সেতু ফেরত পাওয়া নয়, নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।”

তার এই কথায় অনেকে নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন।

এদিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলতে থাকল। ঐশী ও গ্রামের কয়েকজন প্রতিনিধি নিয়মিত আবেদনটির অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নিতে লাগলেন। প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হলো। দুই গ্রামের মানুষও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখলেন।

অবশেষে একটি নতুন ছোট সেতু নির্মাণের জন্য সমীক্ষা ও প্রাথমিক পরিকল্পনার কাজ শুরু হলো। যদিও নির্মাণ শেষ হতে সময় লাগবে, তবু বহুদিন পর মানুষ আশার আলো দেখতে পেলেন।

এর মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হলো। জরুরি প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করা হলো। কৃষকদের বাজারে ফসল নিয়ে যাওয়ার জন্যও একটি সমবায় পরিবহণের উদ্যোগ নেওয়া হলো।

একদিন সন্ধ্যায় ঐশী পুরোনো সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নদীর ওপর তখন সূর্য ডুবছে। লোহার কাঠামোটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে সময়ের দাগ, মরচে আর ভাঙনের চিহ্ন।

নির্মলবাবু এসে পাশে দাঁড়ালেন।

“কী ভাবছিস?”

ঐশী বলল, “ভাবছি, এই সেতুটা কত মানুষের জীবনের গল্প জানে। কত মানুষ এই পথ দিয়ে স্কুলে গেছে, কত মানুষ বাজারে গেছে, কত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।”

নির্মলবাবু বললেন, “সব পুরোনো জিনিসকে ধরে রাখতে হয় না মা। কিছু জিনিসকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানিয়ে তার জায়গায় নিরাপদ নতুন কিছু তৈরি করতে হয়।”

ঐশী মৃদু হেসে বলল, “তাহলে এই সেতুটা শেষ হয়ে গেলেও এর কাজটা শেষ হচ্ছে না।”

“ঠিক তাই। একটা সেতুর আসল কাজ হলো মানুষকে কাছে আনা। লোহা আর পাথর শুধু তার বাহ্যিক রূপ।”

কয়েক মাস পর নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলো। কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে, কিন্তু দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে আবার সেই পুরোনো যোগাযোগ ফিরে আসতে শুরু করল। যৌথ উদ্যোগে বাজারের দিন ঠিক করা হলো, স্কুলের অভিভাবকেরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেন, উৎসবের আমন্ত্রণও আবার দুই পাড়ে পৌঁছতে লাগল।

ঐশী কলেজের একটি প্রকল্পে এই অভিজ্ঞতার কথা লিখল। তার প্রকল্পের শিরোনাম ছিল—‘একটি সেতু, দুই গ্রাম এবং মানুষের সংযোগ’।

প্রকল্পটি উপস্থাপনের সময় সে বলেছিল, “উন্নয়ন মানে শুধু নতুন রাস্তা বা সেতু তৈরি করা নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের প্রকৃত সমস্যাকে বোঝা, নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সমাধানের কাজে সবাইকে যুক্ত করা।”

তার কথা শুনে শিক্ষকরা প্রশংসা করলেন।

এক বছর পর নতুন সেতুটি উদ্বোধনের দিন দুই গ্রামের মানুষ একসঙ্গে উপস্থিত হলেন। শিশুরা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। কৃষকেরা নতুন রাস্তা দিয়ে ফসল নিয়ে বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ঐশী সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকাল। তার মনে হলো, নদী কখনও দুই গ্রামকে আলাদা করেনি। মানুষের তৈরি দূরত্বই তাদের আলাদা করে রেখেছিল।

সেই দূরত্ব কমানোর কাজ শুরু হয়েছিল একজন তরুণীর কয়েকটি প্রশ্ন, কিছু তথ্য সংগ্রহ এবং হাল না ছাড়ার মনোভাব থেকে।

শিক্ষণীয় কথা: কোনো সমস্যাকে শুধু অভিযোগ করে দূর করা যায় না। সঠিক তথ্য সংগ্রহ, ধৈর্য, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তই স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করে। আর উন্নয়নের নামে কখনও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা উচিত নয়। পুরোনোকে সম্মান করে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত অগ্রগতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *