
শহরের পুরোনো অংশে একটি পাড়া ছিল, নাম শ্যামলীবাগ। একসময় এই পাড়ার প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আলাদা আলাদা গল্প। কোথাও ছিল মিষ্টির দোকান, কোথাও পুরোনো বইয়ের ব্যবসা, কোথাও আবার সন্ধ্যা হলেই বসত গানের আসর। পাড়ার মানুষ একে অপরকে শুধু নাম ধরে চিনতেন না, চিনতেন তাঁদের পরিবারের ইতিহাস, পেশা আর ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে।
কিন্তু সময় বদলে গিয়েছিল। পুরোনো বাড়ি ভেঙে তৈরি হয়েছিল বহুতল। অনেক পরিবার অন্য শহরে চলে গিয়েছিল। নতুন মানুষ এসেছিলেন, পুরোনো পরিচিত মুখগুলো হারিয়ে গিয়েছিল।
পাড়ার এক কোণে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাকবিভাগের কর্মী নরেশবাবু। দীর্ঘদিন মানুষের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন তিনি। তাঁর কাছে প্রতিটি ঠিকানা ছিল শুধু বাড়ির নম্বর নয়, একটি পরিবারের পরিচয়।
কিন্তু এখন তাঁর দিন কাটত প্রায় একাই। স্ত্রী মারা গিয়েছেন কয়েক বছর আগে। ছেলে বিদেশে চাকরি করে। ফোনে কথা হয়, কিন্তু দেখা হয় খুব কম।
নরেশবাবুর একটি পুরোনো অভ্যাস ছিল। প্রতিদিন বিকেলে তিনি বাড়ির সামনে বসে পুরোনো খাম, পোস্টকার্ড আর চিঠিগুলো দেখতেন। সেগুলোর বেশিরভাগই তাঁর নিজের সংগ্রহ। কোনো চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছেছিল ভুল ঠিকানার কারণে, কোনোটি প্রাপকের খোঁজ না পেয়ে ফেরত এসেছিল, আবার কোনোটি প্রাপককে খুঁজে পেয়ে নিজে হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
একদিন পাড়ার কলেজপড়ুয়া ঋদ্ধি তাঁর বাড়িতে এল। সে স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে একটি প্রকল্প তৈরি করছিল। পুরোনো পাড়ার পরিবর্তন এবং মানুষের জীবনযাত্রা ছিল তার গবেষণার বিষয়।
ঋদ্ধি নরেশবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, আপনার কাছে কি এই পাড়ার পুরোনো কোনো নথি বা ছবি আছে?”
নরেশবাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “ছবি খুব বেশি নেই। তবে এমন কিছু চিঠি আছে, যেগুলোর ঠিকানা এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
ঋদ্ধির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“দেখতে পারি?”
নরেশবাবু একটি কাঠের বাক্স বের করে দিলেন। বাক্সের ভিতরে ছিল পুরোনো খাম, পোস্টকার্ড এবং কয়েকটি বিবর্ণ কাগজ।
ঋদ্ধি একটি খাম হাতে নিয়ে দেখল, তাতে লেখা—
‘শ্রীযুক্ত অমলকান্তি সেন, বাঁশতলা গলি, শ্যামলীবাগ।’
ঋদ্ধি বলল, “এই গলিটা তো এখন আর নেই!”
নরেশবাবু হেসে বললেন, “নেই ঠিকই। কিন্তু একসময় এই গলিতে বারোটি বাড়ি ছিল। প্রতিটি বাড়ির সামনে আলাদা রকমের গাছ থাকত।”
ঋদ্ধি অবাক হয়ে জানতে চাইল, “এই মানুষগুলোর কেউ এখন কোথায় আছেন, জানেন?”
নরেশবাবু মাথা নাড়লেন।
“সবাইকে তো আর মনে রাখা যায় না। তবে কয়েকজনের নাম মনে আছে।”
সেদিন ঋদ্ধি বাক্সের কয়েকটি চিঠির ছবি তুলে নিয়ে গেল। তার মনে একটি নতুন পরিকল্পনা তৈরি হলো। পুরোনো ঠিকানাগুলোর সঙ্গে বর্তমান পাড়ার সম্পর্ক খুঁজে বের করা যায় কি না, তা সে চেষ্টা করবে।
প্রথমে কাজটি সহজ মনে হলেও দ্রুত বুঝতে পারল, বিষয়টি বেশ জটিল। অনেক বাড়ির নম্বর বদলে গিয়েছে, কিছু রাস্তার নাম পরিবর্তিত হয়েছে, আবার কিছু বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন নির্মাণ হয়েছে।
ঋদ্ধি তাই একা কাজ না করে পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
প্রথমে গেলেন আশি বছরের কমলাদেবীর কাছে। তিনি একসময় বাঁশতলা গলির একটি বাড়িতে থাকতেন।
কমলাদেবী একটি পুরোনো ছবি দেখে বললেন, “এই বাড়িটা তো আমার মামার। এখানে দুর্গাপুজোর সময় সবাই একসঙ্গে খেতে বসত।”
ঋদ্ধি জানতে চাইল, “আপনার মামার পরিবারের কেউ এখন কোথায় থাকেন?”
কমলাদেবী বললেন, “মামার নাতি সুমিত এখন বারাসতে থাকে বলে শুনেছি। অনেক বছর যোগাযোগ নেই।”
ঋদ্ধি নামটি লিখে রাখল।
এরপর সে খোঁজ পেল পুরোনো বইয়ের দোকানের মালিক হরিশচন্দ্র দের পরিবারের। তাঁদের দোকানটি এখন আর নেই। পরিবারের একজন সদস্য অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছেন। আরও কয়েকটি পুরোনো পরিবারের তথ্যও ধীরে ধীরে সংগ্রহ করতে লাগল সে।
কিন্তু ঋদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝেছিল—মানুষের ব্যক্তিগত চিঠি বা ঠিকানা অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা উচিত নয়। তাই সে নরেশবাবুর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল, কোনো পরিবারের পরিচয় বা যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ করা হবে না। যাঁরা স্বেচ্ছায় অংশ নিতে চান, তাঁদের অনুমতি নিয়েই পুরোনো স্মৃতি সংগ্রহ করা হবে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঋদ্ধি একটি ছোট তালিকা তৈরি করল। সেখানে ছিল পাড়ার পুরোনো বাড়ির নাম, সেই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত মানুষের স্মৃতি এবং বর্তমানে বসবাসকারী পরিবারের সম্মতিতে দেওয়া কিছু তথ্য।
একদিন নরেশবাবু তালিকাটি দেখে বললেন, “তুই তো শুধু পুরোনো ঠিকানা খুঁজছিস না, মানুষের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কও খুঁজে বেড়াচ্ছিস।”
ঋদ্ধি হেসে বলল, “সবাইকে আবার একসঙ্গে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় কাকু। তবে মানুষ যেন জানতে পারে, তার পরিবারেরও একটা ইতিহাস আছে।”
এই উদ্যোগের কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার কয়েকজন প্রবীণ মানুষ নিজেদের পুরোনো ছবি ও স্মৃতি ভাগ করে নিতে শুরু করলেন।
একদিন কমলাদেবী ঋদ্ধিকে ফোন করে বললেন, “তুমি কি সুমিতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছ?”
ঋদ্ধি জানাল, “হ্যাঁ, তাঁর পরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান।”
কমলাদেবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “এত বছর পর! জানিস, আমার মামার নাতি ছোটবেলায় আমাকে মাসি বলে ডাকত। শেষবার দেখা হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর আগে।”
কয়েকদিন পর ভিডিও কলে তাঁদের কথা হলো। দুই প্রজন্মের ব্যবধান পেরিয়ে পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে গেল। কমলাদেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তোর মায়ের বানানো নারকেলের নাড়ুর স্বাদ এখনও মনে আছে।”
সুমিতের ছেলে অবাক হয়ে শুনছিল পরিবারের সেই পুরোনো গল্প।
ঋদ্ধি বুঝল, ঠিকানা খোঁজার কাজটি আসলে মানুষকে তার শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজ।
এরপর আরও একটি ঘটনা ঘটল।
নরেশবাবুর বাক্সে থাকা একটি চিঠির খামে লেখা ছিল—‘শ্রীমতী মৃণালিনী দত্ত, দক্ষিণের পুরোনো বাড়ি, শ্যামলীবাগ।’ চিঠিটি কখনও প্রাপকের হাতে পৌঁছয়নি। প্রেরকের নাম ছিল অরুণাভ।
চিঠির ভিতরের লেখা পড়ার আগে নরেশবাবু থেমে গেলেন। তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমি বহু বছর আগে পেয়েছিলাম। ঠিকানা খুঁজে পাইনি। তারপর ব্যক্তিগত বলে আর খোঁজ করিনি।”
ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল, “এখন কি ওই পরিবারের কাউকে চেনেন?”
নরেশবাবু বললেন, “মৃণালিনী দেবীর এক মেয়ে ছিল। নাম ইলা। বিয়ের পর অন্য শহরে চলে গিয়েছিল।”
ঋদ্ধি অনুমতি নিয়ে পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দাদের সাহায্যে ইলার পরিবারের খোঁজ করল। অনেক চেষ্টা করে একটি যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গেল। ইলা দেবী তখন বৃদ্ধা। তিনি চিঠির কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন।
তিনি বললেন, “অরুণাভ আমার ছোট ভাই ছিল। বহু বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
চিঠিটি তাঁর হাতে দেওয়ার আগে নরেশবাবু নিশ্চিত হলেন, পরিবারের সবাই বিষয়টি জানেন এবং তাঁরা এটি গ্রহণ করতে চান।
চিঠির তারিখ ছিল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগের। তাতে অরুণাভ লিখেছিল, সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে চায়। সে বাড়ি ফিরবে বলেও লিখেছিল। কিন্তু চিঠিটি কখনও পৌঁছয়নি।
ইলা দেবী চিঠিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
তিনি বললেন, “মা এই চিঠির জন্য কতদিন অপেক্ষা করেছিলেন! ভাই আর ফিরতে পারেনি। মা-ও চলে গেছেন। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, ওর কথাগুলো এতদিন পর অন্তত আমাদের কাছে পৌঁছল।”
নরেশবাবুর চোখ ভিজে উঠল। এত বছর ধরে নিজের কাছে রেখে দেওয়া চিঠিটি অবশেষে তার প্রাপকের পরিবারের হাতে পৌঁছেছে।
ঋদ্ধি সেদিন বুঝল, সব চিঠি ঠিক সময়ে পৌঁছয় না। তবু কোনো কোনো বার্তা বহু বছর পরেও মানুষের মনে আলো জ্বালাতে পারে।
কয়েক মাসের মধ্যে ঋদ্ধির প্রকল্প শেষ হলো। সে পাড়ার একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করল। সেখানে পুরোনো বাড়ির ছবি, রাস্তার পরিবর্তনের নকশা, বাসিন্দাদের অনুমতিপ্রাপ্ত স্মৃতি এবং ডাকযোগে আদানপ্রদান হওয়া চিঠির ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
প্রদর্শনীর নাম রাখা হলো—‘ঠিকানার ওপারে মানুষ’।
উদ্বোধনের দিন নরেশবাবুকে বিশেষ অতিথি করা হলো। তিনি মঞ্চে উঠে বললেন, “আমি সারাজীবন চিঠি পৌঁছে দিয়েছি। তখন ভাবতাম, ঠিকানা জানা থাকলেই মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়। আজ বুঝছি, শুধু ঠিকানা নয়, মানুষের স্মৃতিও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।”
অনুষ্ঠানের শেষে ঋদ্ধি তাঁকে একটি ছোট উপহার দিল। সেটি ছিল একটি ফ্রেমে বাঁধানো পুরোনো ডাকখামের প্রতিলিপি। তার নিচে লেখা—
‘প্রতিটি ঠিকানার পেছনে একটি জীবন থাকে।’
নরেশবাবু উপহারটি হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আজ মনে হচ্ছে, আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে ঋদ্ধি দেখল, পাড়ার নতুন বাসিন্দাদের কয়েকজন পুরোনো বাসিন্দাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। কেউ কারও বাড়ির ইতিহাস জানতে চাইছেন, কেউ আবার পুরোনো দিনের উৎসবের কথা শুনছেন।
শ্যামলীবাগের বাড়িগুলো হয়তো আগের মতো নেই। অনেক রাস্তার নাম বদলে গিয়েছে। অনেক মানুষও আর এই পৃথিবীতে নেই। তবু তাদের স্মৃতি, সম্পর্ক আর পরিচয়ের কিছু অংশ নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে এসেছে।
ঋদ্ধি বুঝেছিল, একটি পাড়ার ইতিহাস শুধু ইট, কাঠ আর রাস্তার নাম দিয়ে তৈরি হয় না। সেই ইতিহাস তৈরি হয় মানুষের হাসি, কান্না, সম্পর্ক, চিঠি এবং একে অপরকে মনে রাখার মধ্য দিয়ে।
শিক্ষণীয় কথা: আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় নিজেদের শিকড় ও পারিবারিক ইতিহাস ভুলে যাই। অথচ অতীতের স্মৃতি আমাদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করে, অনুমতি নিয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ করলে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের মূল্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কারণ ঠিকানা বদলে যেতে পারে, বাড়ি ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতির মূল্য কখনও হারিয়ে যায় না।












Leave a Reply