
কৃষ্ণপুর গ্রামের এক কোণে ছিল বহু বছরের পুরোনো একটি ছোট্ট শিবমন্দির। মন্দিরটি খুব বড় ছিল না। ছিল না কোনো জাঁকজমক, ছিল না প্রতিদিনের ভিড়। তবু গ্রামের অনেক মানুষের কাছে এই মন্দির ছিল আবেগের জায়গা। ছোটবেলায় তারা বাবা-মায়ের হাত ধরে এখানে আসত। পরীক্ষার আগে প্রণাম করত, নতুন ফসল ঘরে উঠলে প্রথম কিছুটা চাল নিয়ে আসত, আর বিপদের সময় চুপচাপ বসে থাকত মন্দিরের সিঁড়িতে।
মন্দিরের দেখাশোনা করতেন হরিপদ চক্রবর্তী। বয়স প্রায় আশি। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে মন্দিরই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের প্রধান আশ্রয়। প্রতিদিন সকালে তিনি মন্দির পরিষ্কার করতেন, ফুল সাজাতেন, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাতেন।
কিন্তু গত কয়েক বছরে গ্রামের মানুষের আনাগোনা কমে গিয়েছিল। নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ায় গ্রামের অনেকেই অন্য এলাকার বড় মন্দিরে যেতে শুরু করেছিলেন। পুরোনো মন্দিরের দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছিল, ছাদের একাংশে ফাটল ধরেছিল। সন্ধ্যার প্রদীপও অনেক দিন ধরে জ্বলত না।
হরিপদবাবু অবশ্য প্রতিদিন নিয়ম করে মন্দিরে আসতেন। কেউ থাকুক বা না থাকুক, তিনি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতেন।
একদিন গ্রামের স্কুলশিক্ষক অনির্বাণ তাঁর কাছে এসে বললেন, “কাকাবাবু, মন্দিরটার অবস্থা তো খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পঞ্চায়েতে জানিয়েছেন?”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “জানিয়েছিলাম। সবাই বলেছে পরে দেখা হবে। কিন্তু সেই পরে আর আসে না।”
অনির্বাণ বললেন, “গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে কিছু করা যায়। অন্তত মন্দিরটা পরিষ্কার করা দরকার।”
হরিপদবাবু উত্তর দিলেন, “মন্দির পরিষ্কার করা সহজ বাবা। মানুষের মনে যদি এর প্রতি টান না থাকে, তাহলে শুধু দেওয়াল মেরামত করে কী হবে?”
কথাটা অনির্বাণের মনে রয়ে গেল।
সেই গ্রামেই থাকত এক তরুণ, নাম অয়ন। কলেজে পড়াশোনা শেষ করে সে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়ায় তার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল। বন্ধুদের অনেকেই চাকরি পেয়ে শহরে চলে গেছে। কেউ কেউ তাকে নিয়ে ঠাট্টাও করত।
অয়ন ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছিল। বাড়িতে থাকত, পড়ার টেবিলে বসত, কিন্তু মনোযোগ ধরে রাখতে পারত না।
এক সন্ধ্যায় সে মন খারাপ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো শিবমন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল। ভিতরে হরিপদবাবু একটি ছোট প্রদীপ জ্বালাচ্ছিলেন।
অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “এতদিন পরেও আপনি একা একা প্রদীপ জ্বালান কেন?”
হরিপদবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আলো জ্বালানোর জন্য সব সময় অনেক মানুষের দরকার হয় না বাবা। কখনও একজন মানুষও অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কিন্তু একটা ছোট প্রদীপে কি অন্ধকার দূর হয়?”
হরিপদবাবু হাসলেন।
“পুরো অন্ধকার হয়তো দূর হয় না। কিন্তু যে মানুষটা সেই প্রদীপের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার পথটা তো একটু পরিষ্কার হয়।”
কথাগুলো অয়নের মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।
পরদিন থেকে সে সন্ধ্যায় মন্দিরে যেতে শুরু করল। প্রথমে শুধু হরিপদবাবুর সঙ্গে বসে থাকত। তারপর একদিন নিজেই মন্দিরের উঠোন পরিষ্কার করতে শুরু করল।
হরিপদবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কী ব্যাপার অয়ন? আজকাল তোকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে!”
অয়ন হেসে বলল, “ভাবলাম, শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে একটু অন্য কাজও করি।”
কয়েকদিন পর অয়ন তার দুই বন্ধুকে নিয়ে এল। তারা মন্দিরের চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করল। ভাঙা ফুলের টব সরিয়ে নতুন গাছ লাগাল। গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষও তাদের কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন।
কাজ করতে করতে অয়নের মনে হলো, এতদিন সে নিজের ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ কথা বলে ধরে নিয়েছিল। অথচ অন্যের জন্য সামান্য কিছু করতে পারলে নিজের মনও ভালো থাকে।
একদিন মন্দিরের পিছনের অংশ পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা একটি পুরোনো কাঠের আলমারি দেখতে পেল। আলমারিটি বহুদিন খোলা হয়নি। হরিপদবাবুর অনুমতি নিয়ে সেটি পরিষ্কার করা হলো। ভিতরে পাওয়া গেল কিছু পুরোনো পুঁথি, হাতে লেখা কয়েকটি খাতা এবং গ্রামের মানুষের দান-সংক্রান্ত কিছু নথি।
একটি খাতায় অয়ন দেখতে পেল, বহু বছর আগে এই মন্দিরের প্রাঙ্গণে গ্রামের শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হতো। সন্ধ্যায় গ্রামের কয়েকজন শিক্ষিত মানুষ ছোটদের বিনা পয়সায় পড়াতেন। মন্দিরটি শুধু প্রার্থনার জায়গা ছিল না, ছিল গ্রামের মিলনস্থলও।
অয়ন খাতাটি নিয়ে হরিপদবাবুর কাছে গেল।
“কাকাবাবু, এখানে তো লেখা আছে, এই মন্দিরে একসময় পড়াশোনাও হতো!”
হরিপদবাবু খাতাটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“হ্যাঁ বাবা। আমার বাবা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন গ্রামের অনেক বাচ্চার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সন্ধ্যায় এখানে পড়তে আসত।”
অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমরা কি আবার এমন কিছু শুরু করতে পারি?”
হরিপদবাবু বললেন, “চেষ্টা করে দেখতে পারিস। তবে একটা কথা মনে রাখিস, মানুষের উপকারের কাজ যেন কারও বিশ্বাস বা মতের ওপর নির্ভর না করে। এখানে সবাই আসতে পারবে।”
অয়ন সেই কথাটাই গুরুত্ব দিয়ে নিল।
গ্রামের স্কুলশিক্ষক অনির্বাণের সঙ্গে আলোচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নিল, মন্দিরের পাশের খালি ঘরটি সপ্তাহে তিন দিন শিশুদের পড়াশোনার জন্য ব্যবহার করা হবে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালীন নয়, অন্য সময়ে সেখানে পড়াশোনা, গল্পপাঠ এবং সাধারণ জ্ঞানচর্চা হবে।
প্রথম দিন মাত্র পাঁচজন শিশু এল। দ্বিতীয় সপ্তাহে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াল বারো। অয়ন তাদের বাংলা, অঙ্ক ও ইংরেজি পড়াতে লাগল। অনির্বাণবাবু সপ্তাহে দু’দিন এসে পড়াতেন।
একদিন এক ছোট্ট মেয়ে, নাম পিউ, পড়া শেষে অয়নকে বলল, “দাদা, তুমি কি আগে শিক্ষক ছিলে?”
অয়ন হেসে বলল, “না রে। আমিও তোদের মতোই শিখছি।”
পিউ বলল, “তাহলে তুমি আমাদের পড়াতে পারছ কী করে?”
অয়ন উত্তর দিল, “কারণ আমি যা জানি, সেটা তোদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি। শেখার জন্য সব সময় বড় হতে হয় না।”
এই ছোট্ট কথোপকথন অয়নের নিজের মনেও নতুন বিশ্বাস তৈরি করল।
এদিকে মন্দির সংস্কারের কাজও শুরু হলো। গ্রামের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করলেন। কেউ শ্রম দিলেন, কেউ রং কিনে দিলেন, কেউ গাছের চারা আনলেন। কোনো বড় চাঁদা তোলা হলো না। সবাই মিলে অল্প অল্প করে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেলেন।
কিন্তু সবকিছু সহজে হয়নি।
গ্রামের কয়েকজন মানুষ আপত্তি তুললেন। তাঁদের বক্তব্য, মন্দিরের ঘরে পড়াশোনা হলে পবিত্রতা নষ্ট হবে। কেউ আবার বললেন, মন্দিরের কাজের সঙ্গে পড়াশোনার কোনো সম্পর্ক নেই।
অয়ন তাঁদের সঙ্গে তর্কে জড়াল না। সে শান্তভাবে বলল, “আমরা মন্দিরের মূল উপাসনার জায়গায় কোনো পরিবর্তন করছি না। পাশের খালি ঘরটি পরিষ্কার করে শিশুদের পড়ার ব্যবস্থা করছি। এতে কারও অসুবিধা হলে আমরা সময় পরিবর্তন করব।”
হরিপদবাবুও বললেন, “যে জায়গায় মানুষের ভালো চাওয়া হয়, সেখানে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে সবার মতামতকে সম্মান করেই কাজ করতে হবে।”
ধীরে ধীরে আপত্তি কমে এল।
কয়েক মাস পর মন্দিরের চেহারা বদলে গেল। দেওয়ালে নতুন রং, উঠোনে ফুলের গাছ, পাশে শিশুদের পড়ার ঘর। সন্ধ্যায় আবার প্রদীপ জ্বলতে শুরু করল। তবে এবার সেই আলো শুধু মন্দিরের দরজায় সীমাবদ্ধ রইল না। পড়ার ঘরের জানালা দিয়েও তার আভা বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।
অয়নের চাকরির প্রস্তুতি তখনও চলছিল। সে এখনও সফল হয়নি। কিন্তু আগের মতো ভেঙে পড়ত না। প্রতিদিন নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের সময় দিত। সে বুঝতে শিখেছিল, জীবনের মূল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করা যায় না।
একদিন সন্ধ্যায় হরিপদবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কয়েকদিন মন্দিরে আসতে পারলেন না। অয়ন নিজেই তাঁর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিত এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে আসত।
একদিন হরিপদবাবু তাকে বললেন, “তুই জানিস অয়ন, আমি ভাবতাম আমার পরে এই মন্দিরের আলো নিভে যাবে। এখন বুঝতে পারছি, আলো কখনও একজন মানুষের সম্পত্তি নয়। কেউ না কেউ তাকে বাঁচিয়ে রাখে।”
অয়ন তাঁর হাত ধরে বলল, “আপনি শুধু প্রদীপ জ্বালাতে শেখাননি কাকাবাবু। শিখিয়েছেন, নিজের মন খারাপ থাকলেও অন্যের জন্য আলো হওয়া যায়।”
সেদিন সন্ধ্যায় অয়ন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, পিউ আর তার বন্ধুরা পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছে। তাদের হাতে বই, মুখে হাসি। মন্দিরের প্রদীপের আলোয় তাদের ছায়া লম্বা হয়ে রাস্তার ওপর পড়েছে।
অয়ন মনে মনে ভাবল, হয়তো তার নিজের জীবনের পথ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু সে এখন জানে, পথ চলা থামিয়ে দিলে কোনো আলোই কাজে আসে না।
সেই ছোট্ট মন্দির আবার গ্রামের মানুষের কাছে ফিরে এসেছিল। শুধু প্রার্থনার স্থান হিসেবে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি কেন্দ্র হিসেবে।
আর হরিপদবাবুর প্রতিদিনের শেষ প্রদীপটি হয়ে উঠেছিল এক নতুন বিশ্বাসের প্রতীক—যে বিশ্বাস বলে, অন্ধকার যত গভীরই হোক, একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগ অন্য অনেক মানুষের জীবনে আলো পৌঁছে দিতে পারে।
শিক্ষণীয় কথা: জীবনে ব্যর্থতা বা হতাশা এলেই নিজেকে মূল্যহীন ভাবা উচিত নয়। অন্যের পাশে দাঁড়ানো, নিজের সামর্থ্য ভাগ করে নেওয়া এবং ছোট ছোট ভালো কাজের মধ্য দিয়েও মানুষ নতুন করে নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে পারে। আলো জ্বালানোর জন্য বড় শক্তির প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু প্রথম প্রদীপটি জ্বালানোর সাহস।












Leave a Reply