বিশেষ সাক্ষাৎকার | সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও তথ্যভিত্তিক রচনাশৈলীতে নির্মিত
একটি লম্বা কাপড় বা কাগজের পটে একের পর এক ছবি। ছবির সঙ্গে গল্প। আর সেই গল্পের সঙ্গে শিল্পীর কণ্ঠ। বাংলার পটচিত্রের ঐতিহ্য এমনই এক অভিনব শিল্পরীতি, যেখানে ছবি শুধু দেখার বিষয় নয়—ছবির সঙ্গে গল্প বলা এবং গান পরিবেশনেরও সম্পর্ক রয়েছে।
পটুয়ারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয়, লোককাহিনি ও দৈনন্দিন জীবনের বিষয়কে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। পটের প্রতিটি অংশ যেন একটি দৃশ্য, আর সেই দৃশ্যগুলো মিলিয়ে তৈরি হয় একটি সম্পূর্ণ কাহিনি।
কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, গল্প শোনার পদ্ধতি বদলেছে, শিল্পের বাজার বদলেছে। মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডে হাজার ছবি দেখা যায়। ভিডিও প্ল্যাটফর্মে গল্প শোনার জন্যও মানুষকে আর পটুয়ার সামনে বসতে হয় না।
তাহলে কি পটচিত্রের গল্প বলা হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এই প্রাচীন শিল্প নতুন মাধ্যমের সাহায্যে নতুন দর্শক খুঁজে পাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে আমরা মুখোমুখি হয়েছি কাল্পনিক পটচিত্র গবেষক, শিল্পী ও প্রশিক্ষক ঋতব্রত জানা-র সঙ্গে।
প্রশ্ন: পটচিত্রকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
ঋতব্রত জানা: পটচিত্রকে শুধু একটি ছবি বলা ঠিক হবে না। বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—ছবির সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক।
পটের ওপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দৃশ্য আঁকা হয়। শিল্পী সেই দৃশ্য অনুযায়ী গল্প বলেন বা গান করেন। অর্থাৎ এখানে চিত্রশিল্প, গল্প বলা এবং পরিবেশনা—তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
এই কারণে পটচিত্রকে একটি সমন্বিত লোকশিল্প বলা যায়।
প্রশ্ন: একটি পট তৈরির কাজ কোথা থেকে শুরু হয়?
ঋতব্রত জানা: প্রথমে পটের উপযুক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে কাপড় বা অন্য উপযোগী মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে।
তারপর পটের পৃষ্ঠ প্রস্তুত করা হয়। শুকিয়ে নেওয়ার পর আঁকার জন্য উপযুক্ত করা হয়।
এরপর শিল্পী গল্পের দৃশ্য পরিকল্পনা করেন। কোন দৃশ্য কোথায় থাকবে, চরিত্রের অবস্থান কী হবে, কোন অংশে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে—এসব আগে ভাবতে হয়।
তারপর শুরু হয় রেখা ও রঙের কাজ।
প্রশ্ন: পটচিত্রের গল্প কীভাবে নির্বাচন করা হয়?
ঋতব্রত জানা: এর কোনো একক নিয়ম নেই। ঐতিহ্যগতভাবে পৌরাণিক কাহিনি, লোককথা, ধর্মীয় বিষয় এবং বিভিন্ন সামাজিক আখ্যান ব্যবহৃত হয়েছে।
কিন্তু আধুনিক সময়ে শিল্পীরা নতুন বিষয়ও নিতে পারেন।
পরিবেশ, নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, বন্যা, জল সংরক্ষণ, সামাজিক সমস্যা কিংবা কোনো স্থানীয় ইতিহাস—এসব নিয়েও পট তৈরি করা সম্ভব।
এখানেই পটচিত্রের একটি বড় শক্তি রয়েছে। গল্প বলার কাঠামো পুরনো হলেও গল্পের বিষয় নতুন হতে পারে।
প্রশ্ন: পটুয়াদের কাজ কি শুধু ছবি আঁকা?
ঋতব্রত জানা: না। ঐতিহ্যবাহী পটুয়ার ক্ষেত্রে আঁকার পাশাপাশি পরিবেশনার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি পট আঁকা এবং সেই পট খুলে দর্শকের সামনে গল্প বলা—দুটি আলাদা দক্ষতা।
শিল্পীকে ছবির ক্রম মনে রাখতে হয়। কোথায় থামবেন, কোথায় গান করবেন, কোথায় দর্শকের সঙ্গে কথা বলবেন—এসবও পরিবেশনার অংশ।
তাই একজন পটুয়া একই সঙ্গে চিত্রশিল্পী এবং গল্পকার।
প্রশ্ন: পটের গান বা গল্পের গুরুত্ব কতটা?
ঋতব্রত জানা: অত্যন্ত বেশি। কারণ পটের ছবিকে চলমান গল্পে পরিণত করে পরিবেশনাই এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ছবির দৃশ্য দর্শককে দেখায় কী ঘটছে, আর গান বা কথন সেই দৃশ্যের ব্যাখ্যা করে।
এইভাবে একজন পটুয়া দর্শককে একটি দৃশ্য থেকে আরেকটি দৃশ্যে নিয়ে যান।
প্রশ্ন: এখন তো মানুষ মোবাইলে দ্রুত ভিডিও দেখে। পটচিত্রের ধীর গতির গল্প কি দর্শক ধরে রাখতে পারবে?
ঋতব্রত জানা: এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমি এটিকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখি না।
আজ মানুষ ভিডিও দেখে, কিন্তু গল্পের প্রতি আগ্রহ হারায়নি। বরং গল্প বলার নতুন মাধ্যম তৈরি হয়েছে।
পটুয়ারা চাইলে নিজেদের পরিবেশনা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। এতে গ্রামের একটি শিল্পীও শহর বা দেশের অন্য প্রান্তের দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারেন।
অর্থাৎ মাধ্যম বদলেছে, গল্পের প্রয়োজন শেষ হয়নি।
প্রশ্ন: ডিজিটাল মাধ্যম কি পটচিত্রের জন্য হুমকি, নাকি সুযোগ?
ঋতব্রত জানা: দুটোই হতে পারে।
হুমকি তখনই, যখন ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে মানুষ সরাসরি শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ ভুলে যায় এবং শুধু সস্তা নকল ছবি দেখতে থাকে।
আবার সুযোগ তখনই, যখন ডিজিটাল মাধ্যম শিল্পীকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছতে সাহায্য করে।
একজন পটুয়া যদি নিজের পট আঁকার প্রক্রিয়া, গান এবং গল্প অনলাইনে তুলে ধরেন, তাহলে তাঁর পরিচিতি বাড়তে পারে।
প্রশ্ন: পটচিত্রের রঙের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি?
ঋতব্রত জানা: বিভিন্ন অঞ্চলে রঙের ব্যবহার ও প্রস্তুতির পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে রঙ প্রস্তুত করার জ্ঞানও কিছু শিল্পীর কাছে ছিল।
কিন্তু বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য প্রস্তুত রঙ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
প্রাকৃতিক রঙের ঐতিহ্য নথিভুক্ত করা দরকার। তবে কোনো প্রাকৃতিক রঙকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার আগে তার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
প্রশ্ন: পটচিত্রে রঙের চেয়ে রেখার গুরুত্ব বেশি?
ঋতব্রত জানা: অনেক পটচিত্রে রেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চরিত্রের মুখ, শরীর, পোশাক এবং বিভিন্ন বস্তুর পরিচয় রেখার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
একজন দক্ষ শিল্পী অল্প কয়েকটি রেখায় একটি চরিত্রের ভঙ্গি বা আবেগ প্রকাশ করতে পারেন।
এটি বহু বছরের অনুশীলনের ফল।
প্রশ্ন: পটচিত্রের কারিগরি শেখা কি সহজ?
ঋতব্রত জানা: প্রাথমিক পর্যায়ে ছবি আঁকা শেখা সম্ভব, কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রের নিজস্ব ভাষা আয়ত্ত করতে সময় লাগে।
শুধু সুন্দর ছবি আঁকলেই পটুয়া হওয়া যায় না। ধারাবাহিক দৃশ্য তৈরি, গল্পের সঙ্গে ছবির সম্পর্ক, রঙের সামঞ্জস্য এবং প্রয়োজনে পরিবেশনা—সবই জানতে হয়।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্ম কি পটুয়ার পেশায় আসছে?
ঋতব্রত জানা: কিছু তরুণ আসছেন, আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
কারণ ঐতিহ্যবাহী শিল্প থেকে নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
তবে নতুন বাজার তৈরি হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বিশেষ করে শহুরে শিল্পপ্রেমী, পর্যটক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক হস্তশিল্পের বাজারে পটচিত্রের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন: পটচিত্রের বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
ঋতব্রত জানা: শিল্পীর শ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়া একটি বড় সমস্যা।
একটি ছোট পট তৈরি করতেও সময় লাগে। কিন্তু ক্রেতা যদি শুধু আকার দেখে দাম বিচার করেন, তাহলে শিল্পীর শ্রমের মূল্য কমে যায়।
আর একটি সমস্যা হল নকল পণ্য। হাতে আঁকা পটের মতো দেখতে মেশিনে ছাপা ছবি বাজারে এলে ক্রেতা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
প্রশ্ন: মেশিনে ছাপা পটচিত্র কি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ক্ষতি করছে?
ঋতব্রত জানা: যদি মেশিনে ছাপা ছবি হাতে আঁকা বলে বিক্রি করা হয়, তাহলে সমস্যা আছে।
কিন্তু মুদ্রিত পণ্যের নিজস্ব বাজার থাকতে পারে। মানুষ কম দামে একটি পটচিত্রের নকশা ব্যবহার করতে চাইলে প্রিন্টেড পোস্টার কিনতে পারেন।
শুধু পণ্যের পরিচয় পরিষ্কার হওয়া দরকার।
প্রশ্ন: পটচিত্রকে আধুনিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ আছে?
ঋতব্রত জানা: প্রচুর সুযোগ আছে।
ধরুন, একজন শিল্পী জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি পট তৈরি করলেন। অন্য কেউ শহরের বর্জ্য সমস্যা নিয়ে পট বানালেন। কেউ হয়তো কোনো গ্রামের ইতিহাসকে পটে তুলে ধরলেন।
এভাবে পটচিত্র শুধু পুরনো গল্পের মধ্যে আটকে থাকবে না।
আধুনিক সমাজের গল্প বলার জন্যও এটি ব্যবহার করা যাবে।
প্রশ্ন: পটচিত্র কি সাংবাদিকতার মতোও কাজ করতে পারে?
ঋতব্রত জানা: ঐতিহাসিকভাবে লোকশিল্পের বিভিন্ন রূপ মানুষের কাছে খবর, কাহিনি ও সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে আধুনিক সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না।
তবে পটচিত্রের গল্প বলার শক্তি ব্যবহার করে জনসচেতনতামূলক বিষয় তুলে ধরা সম্ভব।
যেমন একটি গ্রামে জল সংরক্ষণ নিয়ে পট তৈরি করা হল। মানুষ ছবি দেখল, গান শুনল এবং বিষয়টি সহজ ভাষায় বুঝল।
এটি যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
প্রশ্ন: পটচিত্রের মাধ্যমে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব?
ঋতব্রত জানা: অবশ্যই। পটের ভাষা সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হতে পারে।
নদী দূষণ, জলাভূমি রক্ষা, প্লাস্টিক বর্জ্য, গাছ লাগানো কিংবা জল সংরক্ষণ—এসব বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক পট তৈরি করা যায়।
বিশেষ করে গ্রামের মানুষ বা শিশুদের সামনে গল্পের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে শিক্ষামূলক মূল্যও থাকতে পারে।
প্রশ্ন: স্কুলে পটচিত্র শেখানো যেতে পারে?
ঋতব্রত জানা: অবশ্যই, এবং এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে গল্প লিখবে। তারপর সেই গল্পকে কয়েকটি দৃশ্যে ভাগ করবে। এরপর প্রতিটি দৃশ্যের ছবি আঁকবে।
এতে গল্প লেখা, ছবি আঁকা এবং ধারাবাহিক চিন্তা—তিনটি দক্ষতা একসঙ্গে তৈরি হয়।
তবে ঐতিহ্যবাহী পটের ইতিহাস শেখানোর সময় আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং প্রকৃত শিল্পীদের অবদানও তুলে ধরতে হবে।
প্রশ্ন: শিশুদের জন্য পটচিত্রের কী বিশেষ মূল্য আছে?
ঋতব্রত জানা: শিশুরা গল্প ও ছবি দুটোই পছন্দ করে। পটচিত্র তাদের গল্পকে দৃশ্যের মধ্যে সাজাতে শেখায়।
একটি দীর্ঘ গল্পকে দশটি ছবিতে ভাগ করতে গেলে শিশুকে ভাবতে হবে কোন ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।
এটি পর্যবেক্ষণ ও সৃজনশীল চিন্তার জন্য ভালো অনুশীলন হতে পারে।
প্রশ্ন: পটচিত্রের সঙ্গে নারীদের ভূমিকা কীভাবে যুক্ত?
ঋতব্রত জানা: বিভিন্ন পরিবার ও অঞ্চলে নারীরা পট আঁকা, রঙ করা, নকশা তৈরি কিংবা পরিবেশনার কাজে যুক্ত থেকেছেন।
কিন্তু শিল্পের ইতিহাসে তাঁদের অবদান সবসময় সমানভাবে নথিভুক্ত হয়নি।
আজ নতুন প্রজন্মের মহিলা শিল্পীরা সরাসরি নিজেদের নামে কাজ করছেন। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
প্রশ্ন: একজন শিল্পী নিজের নামে পণ্য বিক্রি করলে কী সুবিধা হয়?
ঋতব্রত জানা: এতে শিল্পীর পরিচয় তৈরি হয়। ক্রেতা জানতে পারেন কে কাজটি করেছেন।
একজন শিল্পীর নিজস্ব নাম ও ব্র্যান্ড তৈরি হলে তিনি মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করেও বাজার তৈরি করতে পারেন।
তবে ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে মান বজায় রাখা এবং গ্রাহকের বিশ্বাস ধরে রাখাও জরুরি।
প্রশ্ন: পর্যটনের সঙ্গে পটচিত্রের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ঋতব্রত জানা: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একজন পর্যটক যদি কোনো পটুয়ার গ্রামে যান এবং সেখানে সরাসরি পট আঁকা ও গান পরিবেশন দেখতে পান, তাহলে তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু একটি পণ্য কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
তিনি একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন।
তবে পর্যটনের কারণে শিল্পীর কাজ যেন শুধু ‘দেখানোর জিনিস’ হয়ে না যায়। শিল্পীর সম্মান ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রশ্ন: পটশিল্পীদের কি নিজেদের গ্রামের ইতিহাস পটে তুলে ধরা উচিত?
ঋতব্রত জানা: এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ হতে পারে।
কোনো গ্রামের পুরনো নদী, বাজার, মেলা, কৃষিকাজ, উৎসব, হারিয়ে যাওয়া পেশা কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনা—এসব পটে তুলে ধরা যায়।
তবে ইতিহাসের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই জরুরি। লোকগল্প আর ঐতিহাসিক তথ্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করা উচিত।
প্রশ্ন: তাহলে পটচিত্র স্থানীয় ইতিহাসের আর্কাইভও হতে পারে?
ঋতব্রত জানা: দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক নথি হিসেবে অবশ্যই মূল্যবান হতে পারে।
একটি পুরনো গ্রামের পোশাক, নৌকা, বাড়ি, কৃষিকাজ বা বাজারের দৃশ্য কোনো পটে থাকলে ভবিষ্যতের গবেষক সেটি থেকে কিছু তথ্য পেতে পারেন।
তবে পটকে একমাত্র ইতিহাসের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্যান্য নথি, ছবি ও মৌখিক ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
প্রশ্ন: পটশিল্প সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভ করা দরকার?
ঋতব্রত জানা: অত্যন্ত দরকার।
প্রতিটি পটের ছবি, শিল্পীর নাম, গ্রামের নাম, তৈরির সময়, গল্পের বিষয় এবং পরিবেশনার রেকর্ড রাখা যেতে পারে।
শুধু ছবি তুলে রাখলে হবে না। শিল্পীর বক্তব্যও রেকর্ড করা দরকার।
কারণ একই ছবির গল্প একজন শিল্পী যেভাবে বলেন, অন্য শিল্পী হয়তো অন্যভাবে বলতে পারেন।
প্রশ্ন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পটচিত্রের জনপ্রিয়তা বাড়াতে কী করা দরকার?
ঋতব্রত জানা: শুধু পণ্যের ছবি পোস্ট করলে হবে না।
‘একটি পট কীভাবে তৈরি হয়’—এমন ভিডিও করা যেতে পারে। শিল্পীর সঙ্গে ছোট সাক্ষাৎকার করা যেতে পারে। একটি পটের গল্প কয়েকটি পর্বে প্রকাশ করা যেতে পারে।
এতে দর্শক শিল্পীর কাজের প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হবেন।
প্রশ্ন: অনলাইন বিক্রিতে কী ধরনের পটচিত্র বেশি সম্ভাবনাময়?
ঋতব্রত জানা: ছোট আকারের, সহজে পাঠানো যায় এমন পণ্য দিয়ে শুরু করা সুবিধাজনক হতে পারে।
দেওয়ালসজ্জা, ছোট গল্পপট, পোস্টার, নোটবুকের প্রচ্ছদ, শিল্পপ্রিন্ট—বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়।
তবে মূল হাতে আঁকা পটের স্বাতন্ত্র্য যেন হারিয়ে না যায়।
প্রশ্ন: পটচিত্রের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও কি শিল্পীর পরিচয় দেওয়া উচিত?
ঋতব্রত জানা: অবশ্যই।
প্যাকেটের মধ্যে একটি ছোট কার্ড রাখা যেতে পারে যেখানে শিল্পীর নাম, গ্রামের নাম এবং পটের গল্প সংক্ষেপে লেখা থাকবে।
তাহলে ক্রেতা বুঝবেন তিনি কার কাজ কিনেছেন।
এই স্বচ্ছতা শিল্পীর সঙ্গে ক্রেতার সম্পর্ক তৈরি করে।
প্রশ্ন: পটচিত্রে আধুনিক রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয় আনা যায়?
ঋতব্রত জানা: সামাজিক বিষয় অবশ্যই আনা যায়। তবে কোনো সমকালীন বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করলে তথ্য যাচাই ও ভারসাম্য জরুরি।
পটচিত্রকে সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু শিল্পীর স্বাধীনতা ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: পটুয়াদের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য কী করা দরকার?
ঋতব্রত জানা: শুধু উৎসবের সময় বিক্রির ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
সারা বছর কর্মশালা, স্কুল প্রোগ্রাম, পর্যটন, অনলাইন বিক্রি, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
একজন শিল্পীর আয় যেন শুধু একটি পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর না করে—এমন বহুমুখী ব্যবস্থা দরকার।
প্রশ্ন: পটুয়া পরিবারগুলির শিশুদের কি ছোটবেলা থেকেই কাজ শেখানো উচিত?
ঋতব্রত জানা: ঐতিহ্য শেখানো ভালো, কিন্তু শিশুর শিক্ষার বিকল্প হিসেবে নয়।
একজন শিশুকে তার পারিবারিক শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করানো যেতে পারে। কিন্তু তাকে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগও দিতে হবে।
যে শিশু পটচিত্র শিখতে চায়, তাকে ভালো প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর যে অন্য পেশায় যেতে চায়, তার সেই সুযোগও থাকা দরকার।
প্রশ্ন: পটচিত্র কি আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে?
ঋতব্রত জানা: সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ গল্পভিত্তিক লোকশিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে হলে মান, প্যাকেজিং, পণ্যের তথ্য, পরিবহণ এবং কপিরাইট বা ডিজাইন-সংক্রান্ত সচেতনতা দরকার।
শিল্পীকে নিজের কাজের গল্প ইংরেজি বা অন্য ভাষায় সংক্ষেপে তুলে ধরার দক্ষতাও অর্জন করতে হতে পারে।
প্রশ্ন: বিদেশি বাজারের জন্য কাজ করতে গেলে কি পটচিত্রের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হতে পারে?
ঋতব্রত জানা: হতে পারে, যদি বাজারের চাহিদার জন্য শিল্পী নিজের ভাষা পুরোপুরি বদলে ফেলেন।
কিন্তু নতুন দর্শকের জন্য ব্যাখ্যা যোগ করা আর শিল্পের মূল রূপ বদলে ফেলা এক জিনিস নয়।
আমাদের উচিত এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে বিদেশি দর্শক পটচিত্র বুঝতে পারেন, কিন্তু পটচিত্রকে তাঁদের রুচি অনুযায়ী পুরোপুরি অন্য কিছু বানিয়ে না ফেলি।
প্রশ্ন: আপনার মতে পটচিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
ঋতব্রত জানা: গল্প বলার ক্ষমতা।
একটি ছবির মধ্যে একটি মুহূর্ত থাকে। কিন্তু পটে ধারাবাহিক ছবি থাকে। ফলে শিল্পী সময়কে ছবির মধ্যে সাজাতে পারেন।
একটি পট খুলতে খুলতে দর্শক যেন একটি গল্পের ভেতর দিয়ে হাঁটেন।
আজকের দ্রুতগতির সময়ে এই ধীর অভিজ্ঞতাটিই আবার নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন: সবচেয়ে বড় সংকট?
ঋতব্রত জানা: কারিগরি জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া এবং শিল্পীর ন্যায্য মূল্য না পাওয়া।
পট কিনে আমরা যদি শুধু ছবিটি দেখি কিন্তু শিল্পীর সময় ও দক্ষতা না বুঝি, তাহলে শিল্পের অর্থনীতি দুর্বল থাকবে।
আর তরুণেরা যদি মনে করেন এই পেশায় ভবিষ্যৎ নেই, তাহলে কয়েক দশক পরে দক্ষ শিল্পীর সংখ্যা কমে যেতে পারে।
প্রশ্ন: তাহলে পটচিত্র বাঁচানোর প্রথম কাজ কী?
ঋতব্রত জানা: প্রথম কাজ হল পটুয়াদের কথা শোনা।
তাঁদের কী সমস্যা, কী ধরনের বাজার চান, কীভাবে কাজ করেন, কী শেখাতে চান—এসব তাঁদের কাছ থেকেই জানতে হবে।
তারপর প্রশিক্ষণ, বাজার, ডিজিটাল সংযোগ এবং নথিভুক্তকরণের ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন—আগামী দিনে পটচিত্রকে আপনি কোথায় দেখতে চান?
ঋতব্রত জানা: আমি চাই পটচিত্র শুধু সংগ্রহশালার দেওয়ালে ঝুলে না থাকুক।
আমি চাই স্কুলে শিশুরা পটের মাধ্যমে গল্প শিখুক। শহরের মানুষ পটুয়ার কাছ থেকে সরাসরি পট কিনুন। পর্যটকরা শিল্পীর কাজ দেখুন। অনলাইনে বিশ্বের মানুষ পটের গল্প শুনুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পটুয়ার সন্তান যেন গর্ব করে বলতে পারেন, ‘আমার বাবা-মা শিল্পী।’
কারণ কোনো শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হল সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষকে মর্যাদা ও জীবিকার সুযোগ দেওয়া।
পটচিত্রের গল্প শেষ হয়ে যায়নি। গল্প বলার মাধ্যম বদলেছে। এখন প্রশ্ন হল, আমরা কি সেই পুরনো গল্প বলার শক্তিকে নতুন সময়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পারব?
যদি পারি, তাহলে একটি দীর্ঘ পটের প্রতিটি ছবির মতোই এই শিল্পও এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে এগিয়ে যেতে থাকবে।
শেষকথা
পটচিত্রের বিশেষত্ব তার ছবিতে যেমন, তেমনই তার গল্প বলার পদ্ধতিতে। একটি পট খুলতে খুলতে শিল্পী দর্শককে নিয়ে যান একটি ধারাবাহিক কাহিনির ভেতর। এই ঐতিহ্য শুধু শিল্পের ইতিহাস নয়—এটি লোকসমাজের গল্প বলার একটি নিজস্ব পদ্ধতি।
আধুনিক প্রযুক্তি এই শিল্পের সামনে যেমন নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, তেমনই তৈরি করেছে নতুন দর্শকের দরজাও।
সঠিক প্রশিক্ষণ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, ডিজিটাল বিপণন, স্থানীয় ইতিহাসের নথিভুক্তকরণ এবং নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ—এসবের মাধ্যমে পটচিত্র নতুন সময়ে নতুন জীবন পেতে পারে।
একদিন হয়তো গ্রামের কোনো পটুয়া তাঁর পট খুলে সরাসরি কয়েকজন দর্শকের সামনে গল্প বলবেন, আর একই সঙ্গে সেই গল্পের ভিডিও হাজার হাজার মানুষ দেখবেন মোবাইলের পর্দায়।
মাধ্যম বদলালেও যদি গল্প, ছবি এবং শিল্পীর হাত—এই তিনটি একসঙ্গে থাকে, তাহলে পটচিত্রের যাত্রা থামবে না।
নোট: এই সাক্ষাৎকারের ব্যক্তি, বক্তব্য ও সংলাপ সম্পূর্ণ কাল্পনিক; সংবাদপোর্টালের ফিচার/সাক্ষাৎকার বিভাগে প্রকাশযোগ্য তথ্যভিত্তিক রচনাশৈলীতে নির্মিত।













Leave a Reply