বিশেষ সাক্ষাৎকার | সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও তথ্যভিত্তিক রচনাশৈলীতে নির্মিত
একটি পুরনো শাড়ি, একটি ব্যবহৃত ধুতি, কিংবা বহুদিনের পুরনো কাপড়—যে জিনিসকে আমরা সহজেই অপ্রয়োজনীয় বলে সরিয়ে রাখি, বাংলার গ্রামীণ নারীর হাতে সেটিই কখনও হয়ে উঠেছে স্মৃতি, শিল্প এবং গল্পের এক অনন্য ক্যানভাস। সূচ আর সুতো দিয়ে কাপড়ের ওপর তৈরি হয়েছে ফুল, পাখি, গাছ, লতা, মানুষের জীবন, লোককথা, উৎসব, সংসারের নানা দৃশ্য এবং কখনও ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
এই শিল্পই নকশিকাঁথা।
নকশিকাঁথার সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য তৈরি একটি কাপড় নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল ব্যবহারিক সামগ্রী, আবার একই সঙ্গে ছিল নারীদের সৃজনশীলতার প্রকাশ। পুরনো কাপড়কে স্তরে স্তরে রেখে সেলাই করে তৈরি হওয়া কাঁথার প্রতিটি ফোঁড় যেন একটি গল্প বহন করে।
সময়ের সঙ্গে পোশাকের ব্যবহার বদলেছে, বাজারে এসেছে মেশিনে তৈরি কম্বল ও নানা ধরনের প্রস্তুত সামগ্রী। ফলে ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার ব্যবহার ও উৎপাদনের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে হস্তশিল্প, লোকশিল্প এবং হাতে তৈরি পণ্যের নতুন বাজারও তৈরি হয়েছে।
নকশিকাঁথার ইতিহাস, নারীর অদৃশ্য শ্রম, নকশার ভাষা এবং আধুনিক বাজারে এই শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললেন কাল্পনিক লোকশিল্প গবেষক ও নকশিকাঁথা প্রশিক্ষক সুচরিতা মণ্ডল।
প্রশ্ন: প্রথমেই জানতে চাই, নকশিকাঁথা আসলে কী?
সুচরিতা মণ্ডল: খুব সহজভাবে বললে, পুরনো বা ব্যবহৃত কাপড়ের একাধিক স্তর একসঙ্গে রেখে সূচ-সুতোর সাহায্যে সেলাই করে তৈরি করা কাঁথাকে নকশিকাঁথা বলা হয়, যখন তার ওপর আলংকারিক নকশা বা সেলাইয়ের মাধ্যমে বিশেষ শিল্পরূপ তৈরি করা হয়।
কিন্তু নকশিকাঁথাকে শুধু ‘পুরনো কাপড়ের পুনর্ব্যবহার’ হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
এর মধ্যে রয়েছে নারীর সৃজনশীলতা, পারিবারিক স্মৃতি, স্থানীয় নকশা, লোকজ বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য। একটি পুরনো কাঁথা খুলে দেখলে অনেক সময় সেই পরিবারের জীবনযাত্রারও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার সঙ্গে বাংলার নারীদের সম্পর্ক এত গভীর কেন?
সুচরিতা মণ্ডল: ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ পরিবারের অনেক মহিলা ঘরের কাজের পাশাপাশি অবসর সময়ে কাঁথা সেলাই করতেন। এটি ছিল এমন একটি কাজ যা বাড়িতে বসেই করা যেত।
তখন আলাদা করে শিল্পী হওয়ার ধারণা ছিল না। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তৈরি করা কাঁথাই ধীরে ধীরে শিল্পের রূপ নিত।
একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য কাঁথা তৈরি করতে পারেন, একজন দাদি নাতির জন্য তৈরি করতে পারেন, আবার কোনো নারী নিজের জীবনের স্মৃতি নকশার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
ফলে কাঁথা হয়ে উঠত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের একটি বস্তু।
প্রশ্ন: একটি নকশিকাঁথার নকশায় সাধারণত কী কী দেখা যায়?
সুচরিতা মণ্ডল: অঞ্চল ও শিল্পীর ওপর নির্ভর করে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। ফুল, পাতা, পাখি, মাছ, গাছ, সূর্য, চাঁদ, নৌকা, মানুষ, গৃহস্থালির দৃশ্য—বিভিন্ন ধরনের নকশা দেখা যায়।
কখনও দেখা যায় একটি কেন্দ্রীয় নকশাকে ঘিরে চারদিকে ছোট ছোট মোটিফ। আবার কোনো কাঁথায় সম্পূর্ণ পৃষ্ঠজুড়ে সূচের কাজ থাকে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, শিল্পী সবসময় বাস্তব জিনিসের হুবহু ছবি আঁকেন না। তিনি নিজের কল্পনা অনুযায়ী আকার পরিবর্তন করেন।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার সেলাই কি শুধু সাজানোর জন্য?
সুচরিতা মণ্ডল: না। সেলাইয়ের একটি ব্যবহারিক দিকও রয়েছে। কাপড়ের স্তরগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখার জন্য সেলাই দরকার।
তার ওপর সেই সেলাই যদি নিয়মিত ও সুন্দর হয়, তাহলে সেটিই নকশায় পরিণত হয়।
অর্থাৎ এখানে ব্যবহারিক প্রয়োজন এবং শিল্প—দুটো একসঙ্গে কাজ করে। এই কারণেই নকশিকাঁথা বিশেষ।
প্রশ্ন: পুরনো কাপড় ব্যবহার করার বিষয়টি কি পরিবেশের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ?
সুচরিতা মণ্ডল: অবশ্যই। কোনো কাপড়কে ফেলে না দিয়ে নতুন কাজে ব্যবহার করা পুনর্ব্যবহারের একটি উদাহরণ।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—হাতে তৈরি পুনর্ব্যবহারকে পরিবেশবান্ধব বলার আগে কাপড়ের ধরন, রং, সুতো এবং ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণের প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।
তবু সামগ্রিকভাবে একটি ব্যবহৃত কাপড়কে নতুন জীবন দেওয়ার ধারণাটি খুবই মূল্যবান।
আজকের ‘আপসাইক্লিং’ ধারণার সঙ্গে নকশিকাঁথার ঐতিহ্যগত কাজের কিছু মিল রয়েছে।
প্রশ্ন: তাহলে বলা যায়, নকশিকাঁথা আধুনিক আপসাইক্লিংয়ের অনেক আগের উদাহরণ?
সুচরিতা মণ্ডল: ধারণাগতভাবে অনেকটাই বলা যায়। তবে ঐতিহাসিক কোনো শিল্পকে আধুনিক শব্দ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
গ্রামীণ পরিবারে পুরনো কাপড়ের ব্যবহার ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। একটি কাপড়ের যতটা সম্ভব দীর্ঘ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার ছিল।
সেখান থেকেই পুনর্ব্যবহার এবং সৃজনশীলতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথা তৈরিতে কত সময় লাগে?
সুচরিতা মণ্ডল: আকার, নকশা এবং কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে সময় অনেক বদলে যায়।
একটি সাধারণ কাঁথা তুলনামূলকভাবে দ্রুত তৈরি হতে পারে। কিন্তু সূক্ষ্ম নকশা, ঘন সেলাই এবং বড় আকারের কাঁথা তৈরি করতে অনেক সপ্তাহ বা মাসও লাগতে পারে।
এখানে সমস্যা হল, বাজারে অনেক সময় ক্রেতা শুধু চূড়ান্ত পণ্যটি দেখেন। কত ঘণ্টা একজন শিল্পী সূচ হাতে বসে ছিলেন, সেটি চোখে দেখা যায় না।
প্রশ্ন: এই কারণেই কি হাতে তৈরি কাঁথার দাম অনেক সময় বেশি হয়?
সুচরিতা মণ্ডল: হওয়া উচিত। কারণ দাম নির্ধারণে শুধু কাপড় ও সুতোর খরচ নয়, শ্রমের মূল্যও যুক্ত হওয়া দরকার।
একজন শিল্পী যদি কয়েক মাস ধরে একটি কাজ করেন, তাহলে সেটিকে কারখানায় কয়েক ঘণ্টায় তৈরি হওয়া পণ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
হাতে তৈরি পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমঘণ্টা, নকশার জটিলতা এবং দক্ষতা বিবেচনা করা জরুরি।
প্রশ্ন: গ্রামীণ নারীদের জন্য নকশিকাঁথা কি আয়ের পথ হতে পারে?
সুচরিতা মণ্ডল: অবশ্যই। বিশেষ করে বাড়িতে বসে কাজ করার সুযোগ থাকায় এটি অনেক নারীর জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে শুধু কাঁথা তৈরি করলেই আয় নিশ্চিত হয় না। বাজারে পৌঁছতে হবে, সঠিক দাম পেতে হবে এবং ক্রেতার চাহিদা বুঝতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রে নারী শিল্পী কাজ করেন, কিন্তু পণ্য বিক্রি করেন অন্য কেউ। ফলে প্রকৃত কারিগর বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন না।
এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার।
প্রশ্ন: মহিলাদের শ্রমের মূল্য কম দেওয়ার প্রবণতা কি রয়েছে?
সুচরিতা মণ্ডল: হস্তশিল্পে এই সমস্যা বিভিন্নভাবে দেখা যায়। বিশেষ করে বাড়িতে করা কাজকে ‘ঘরের কাজ’ হিসেবে ধরে নেওয়া হলে অর্থনৈতিক মূল্য কমে যায়।
একজন নারী যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সেলাই করেন, সেটি তাঁর শ্রম। পরিবারের সদস্যরা সেই শ্রমকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিলেও বাজারের হিসাবের ক্ষেত্রে তার মূল্য থাকা উচিত।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আলোচনায় এই অদৃশ্য শ্রমের মূল্যায়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার মাধ্যমে কি নারীরা নিজেদের গল্পও প্রকাশ করেছেন?
সুচরিতা মণ্ডল: অনেক ক্ষেত্রেই করেছেন। তবে প্রতিটি নকশার নির্দিষ্ট অর্থ আছে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
একজন শিল্পী যে ফুলটি এঁকেছেন, সেটি হয়তো শুধু তাঁর পছন্দের ফুল। আবার অন্য কারও কাছে একই ফুলের আলাদা অর্থ থাকতে পারে।
তাই নকশা ব্যাখ্যা করার সময় শিল্পীর নিজের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: একটি পুরনো নকশিকাঁথা কি ইতিহাসের দলিল হতে পারে?
সুচরিতা মণ্ডল: নির্দিষ্ট অর্থে অবশ্যই গবেষণার উপাদান হতে পারে। একটি কাঁথায় যে পোশাক, গৃহস্থালির সামগ্রী, নৌকা, কৃষিকাজ বা সামাজিক দৃশ্য দেখা যায়, তা সেই সময়ের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
তবে একটি কাঁথা দেখে পুরো সমাজ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সেটিকে অন্যান্য ঐতিহাসিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার গল্পে পুরুষদের উপস্থিতি কি কম?
সুচরিতা মণ্ডল: শিল্পের উৎপাদনে নারীর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরুষদের ভূমিকা একেবারে নেই—এমন নয়।
কাঁচামাল সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ, বিক্রি বা পরিবারের ব্যবসা পরিচালনায় পুরুষেরা যুক্ত থাকতে পারেন।
কিন্তু নকশা ও সেলাইয়ের শ্রমে নারীর অবদান অনেক সময় নথিভুক্ত হয়নি। তাই ইতিহাস লিখতে গেলে নারীর শ্রমকে আলাদা করে সামনে আনা জরুরি।
প্রশ্ন: বর্তমানে মেশিনে তৈরি নকশিকাঁথার মতো পণ্য বাজারে রয়েছে। এতে সমস্যা কোথায়?
সুচরিতা মণ্ডল: সমস্যা তখনই হয় যখন মেশিনে তৈরি পণ্যকে হাতে তৈরি বলে বিক্রি করা হয়।
ক্রেতার অধিকার রয়েছে পণ্যটি কীভাবে তৈরি হয়েছে তা জানার। হাতে সেলাই করা এবং মেশিনে তৈরি পণ্যের দাম ও কারিগরি মূল্য এক নয়।
তাই পণ্যের লেবেলিং এবং স্বচ্ছ তথ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: মেশিন কি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের শত্রু?
সুচরিতা মণ্ডল: সবসময় নয়। মেশিন কিছু কাজ সহজ করতে পারে। কিন্তু যে জায়গায় হাতে তৈরি নকশা ও সূক্ষ্ম সেলাইয়ের মূল্য রয়েছে, সেখানে হাতে কাজের নিজস্ব পরিচয় থাকবে।
আমাদের উচিত ‘মেশিন বনাম হাত’ এই সরল দ্বন্দ্বে না গিয়ে কোন পণ্য কোন বাজারের জন্য তা বোঝা।
হাতে তৈরি শিল্পের মূল্য তার স্বাতন্ত্র্যে।
প্রশ্ন: আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে নকশিকাঁথাকে কীভাবে যুক্ত করা যায়?
সুচরিতা মণ্ডল: অনেকভাবেই করা যায়।
শুধু বড় কাঁথা নয়—কুশন কভার, ব্যাগ, দেওয়ালসজ্জা, টেবিল রানার, ছোট পাউচ, পোশাকের অংশ এবং বিভিন্ন গৃহসজ্জার সামগ্রীতে নকশিকাঁথার কাজ ব্যবহার করা যায়।
তবে ডিজাইন পরিবর্তনের সময় ঐতিহ্যবাহী সেলাই ও কারিগরির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা উচিত।
প্রশ্ন: তরুণ ক্রেতাদের কাছে নকশিকাঁথা আকর্ষণীয় করার উপায় কী?
সুচরিতা মণ্ডল: প্রথমে গল্প বলতে হবে।
একটি পণ্য শুধু ‘হ্যান্ডমেড’ লিখে বিক্রি করলে সবাই আগ্রহী হবেন না। কিন্তু যদি বলা যায়—এই নকশাটি একজন গ্রামের শিল্পী নিজের এলাকার প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছেন, তখন পণ্যের সঙ্গে একটি গল্প তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক রঙ, মাপ ও ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রক্রিয়া দেখাতে হবে।
প্রশ্ন: অনলাইন বাজারে নকশিকাঁথার সম্ভাবনা কেমন?
সুচরিতা মণ্ডল: ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ হাতে তৈরি পণ্যের গল্প অনলাইনে সুন্দরভাবে তুলে ধরা যায়।
একজন কারিগর সূচ দিয়ে একটি নকশা করছেন—এমন ছোট ভিডিওই ক্রেতার কাছে পণ্যের মূল্য বোঝাতে পারে।
তবে অনলাইন বিক্রির সঙ্গে প্যাকেজিং, ডেলিভারি, রিটার্ন, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর এবং হিসাবরক্ষণও যুক্ত। তাই প্রশিক্ষণ দরকার।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার ক্ষেত্রে নকল বা ডিজাইন চুরির সমস্যা আছে কি?
সুচরিতা মণ্ডল: হস্তশিল্পে নকশা অনুকরণের সমস্যা থাকতে পারে। কোনো শিল্পীর বিশেষ নকশা অন্য কেউ হুবহু নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করলে শিল্পীর স্বীকৃতি ও আয়ের প্রশ্ন ওঠে।
তাই ডিজাইন নথিভুক্ত করা, কারিগরের নাম উল্লেখ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বৌদ্ধিক সম্পদ সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরি করা দরকার।
তবে লোকশিল্পের নকশা নিয়ে মালিকানার প্রশ্ন জটিল। বহু নকশা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। তাই সবকিছুকে ব্যক্তিগত মালিকানার আওতায় আনা যায় না।
প্রশ্ন: পুরনো নকশিকাঁথা সংরক্ষণের সঠিক উপায় কী?
সুচরিতা মণ্ডল: প্রথমে পরিষ্কার, শুকনো ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দরকার। দীর্ঘদিন ভাঁজ করে চাপা অবস্থায় রাখলে কাপড়ের ক্ষতি হতে পারে।
আর্দ্রতা, অতিরিক্ত আলো, পোকামাকড় এবং অনুপযুক্ত সংরক্ষণ থেকে সাবধান থাকতে হয়।
পুরনো কাঁথা পরিষ্কার করার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। সব পুরনো কাপড় বাড়িতে সাধারণভাবে ধুয়ে ফেলা নিরাপদ নয়।
প্রশ্ন: পরিবারের পুরনো কাঁথা কি ফেলে দেওয়া উচিত?
সুচরিতা মণ্ডল: একেবারেই নয়, যদি সেটির ঐতিহাসিক বা পারিবারিক মূল্য থাকে।
একটি পুরনো কাঁথায় হয়তো আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের হাতের কাজ রয়েছে। সেটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিবারের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সংরক্ষণের আগে কাঁথার অবস্থা যাচাই করা দরকার।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথাকে জাদুঘরে রাখার পাশাপাশি জীবন্ত শিল্প হিসেবে রাখার উপায় কী?
সুচরিতা মণ্ডল: দুটো কাজ একসঙ্গে করতে হবে।
জাদুঘরে পুরনো কাঁথা সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি জীবিত শিল্পীদের কাজের সুযোগ দিতে হবে।
শুধু পুরনো কাঁথা প্রদর্শন করে যদি আমরা বলি ‘এই শিল্প ছিল’, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি মৃত ঐতিহ্য হয়ে যাবে।
বরং প্রদর্শনীর পাশাপাশি কর্মশালা, লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন এবং বাজার তৈরি করা দরকার।
প্রশ্ন: পর্যটনের সঙ্গে নকশিকাঁথাকে যুক্ত করা যায়?
সুচরিতা মণ্ডল: অবশ্যই। পর্যটকেরা কোনো অঞ্চলে গেলে স্থানীয় হস্তশিল্প কিনতে আগ্রহী হন।
কিন্তু সেখানে একটি সমস্যা আছে—অনেক সময় পর্যটকদের জন্য তৈরি সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত হাতে তৈরি পণ্যের পার্থক্য থাকে।
তাই কারিগরের পরিচয়, কাজের ধরন এবং পণ্যের তথ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার।
প্রশ্ন: স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নকশিকাঁথার সঙ্গে পরিচয় করানো দরকার বলে মনে করেন?
সুচরিতা মণ্ডল: অবশ্যই। কারণ এটি শুধু সেলাই শেখানোর বিষয় নয়।
এর মাধ্যমে শিশুরা পুনর্ব্যবহার, নকশা, ইতিহাস, গণিত, শিল্প এবং পরিবারের স্মৃতি—অনেক কিছু শিখতে পারে।
স্কুলে ‘আমাদের বাড়ির পুরনো কাপড়ের গল্প’ ধরনের প্রকল্প করা যেতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা পরিবারের পুরনো কাঁথা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
এতে ইতিহাস বইয়ের বাইরেও ইতিহাস শেখার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার কাজে গণিতের ব্যবহার কোথায়?
সুচরিতা মণ্ডল: নকশার পুনরাবৃত্তি, প্রতিসাম্য, দূরত্ব এবং মাপের মধ্যে গণিত রয়েছে।
একটি বর্ডার তৈরি করার সময় একই মোটিফ নির্দিষ্ট ব্যবধানে পুনরাবৃত্তি করতে হয়। কেন্দ্রীয় নকশার চারদিকে ভারসাম্য রাখতে হয়।
অর্থাৎ একজন শিল্পী হয়তো গণিতের সূত্র ব্যবহার করছেন না, কিন্তু তাঁর কাজের মধ্যে জ্যামিতিক চিন্তা রয়েছে।
প্রশ্ন: একজন নতুন শিল্পীকে আপনি কীভাবে প্রশিক্ষণ দেন?
সুচরিতা মণ্ডল: প্রথমে কাপড় ও সুতোর ব্যবহার শেখাই। তারপর সাধারণ সেলাই। এরপর ছোট মোটিফ।
একেবারে শুরুতেই বড় নকশা করতে বলি না। কারণ হাতের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে সময় লাগে।
তারপর বর্ডার, পুনরাবৃত্ত নকশা এবং ধীরে ধীরে স্বাধীন ডিজাইন শেখানো হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ধৈর্য।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে নকশিকাঁথা তৈরির জন্য কাঁচামাল সংগ্রহে কোনো পরিবর্তন এসেছে?
সুচরিতা মণ্ডল: অবশ্যই। আগে বাড়ির পুরনো কাপড়ই প্রধান উপাদান ছিল। এখন বাজার থেকে নতুন কাপড়, বিশেষ সুতো এবং অন্যান্য উপকরণ কেনা হয়।
ফলে ‘পুরনো কাপড়ের কাঁথা’ এবং ‘বাজারের উপকরণ দিয়ে তৈরি নকশিকাঁথা’—দুই ধরনের কাজই দেখা যায়।
দুটিরই নিজস্ব বাজার থাকতে পারে, কিন্তু ক্রেতাকে পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত পণ্যটি কীভাবে তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন: নকশিকাঁথার শিল্প কি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে?
সুচরিতা মণ্ডল: যদি সঠিক বাজার তৈরি হয়, তাহলে অবশ্যই পারে।
একজন শিল্পী কাজ করবেন, তাঁর পরিবার যুক্ত থাকবে, সুতো ও কাপড়ের ব্যবসা হবে, প্যাকেজিংয়ের কাজ হবে, পরিবহণ হবে, অনলাইন বিপণন হবে—একটি ছোট পণ্যের চারপাশে অনেক অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হতে পারে।
তবে এর জন্য কারিগরের হাতে প্রকৃত আয় পৌঁছানো জরুরি।
প্রশ্ন: নারী শিল্পীদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সুচরিতা মণ্ডল: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি একজন নারী নিজেই নিজের পণ্যের ছবি তুলতে পারেন, দাম নির্ধারণ করতে পারেন, ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং টাকা গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে তাঁর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ে।
এর জন্য ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, হিসাবরক্ষণ এবং ব্যবসায়িক জ্ঞান প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে নকশিকাঁথার সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায় দেখছেন?
সুচরিতা মণ্ডল: আমি তিনটি বড় সুযোগ দেখি।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক হস্তশিল্পের বাজার।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক বাড়ির গৃহসজ্জা ও জীবনযাপনের পণ্য।
তৃতীয়ত, গল্পভিত্তিক ও সীমিত সংস্করণের সংগ্রহযোগ্য শিল্পকর্ম।
একজন শিল্পীর জীবনের গল্প, তাঁর গ্রামের পরিচয় এবং একটি নির্দিষ্ট নকশার ইতিহাস—এসব একসঙ্গে তুলে ধরলে পণ্যটি শুধু বস্তু থাকে না, একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন: কিন্তু বাজার বাড়লে কি নকশিকাঁথার স্বাভাবিক চরিত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই?
সুচরিতা মণ্ডল: আশঙ্কা আছে। অতিরিক্ত বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে দ্রুত উৎপাদনের চাপ আসতে পারে। তখন হাতে কাজের গুণমান কমতে পারে।
তাই বাজারের সঙ্গে গুণমান নিয়ন্ত্রণও দরকার।
কারিগরকে বেশি উৎপাদন করতে বললেই হবে না। তাঁকে এমন দাম দিতে হবে যাতে তিনি ধীরে, যত্ন করে কাজ করতে পারেন।
প্রশ্ন: আপনার মতে, নকশিকাঁথা সংরক্ষণের সবচেয়ে জরুরি কাজ কোনটি?
সুচরিতা মণ্ডল: আমি বলব—কারিগরকে সংরক্ষণ করুন, শুধু কাঁথাকে নয়।
পুরনো কাঁথা জাদুঘরে রেখে দেওয়া যায়। কিন্তু সেই কাঁথা তৈরি করার জ্ঞান যদি হারিয়ে যায়, তাহলে নতুন কাঁথা তৈরি হবে না।
তাই প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে কাজের পদ্ধতি নথিভুক্ত করতে হবে এবং তরুণদের হাতে সেই দক্ষতা তুলে দিতে হবে।
প্রশ্ন: একজন তরুণী যদি এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে চান, আপনার পরামর্শ কী?
সুচরিতা মণ্ডল: প্রথমে ভালোভাবে হাতের কাজ শিখুন। তারপর নিজের ডিজাইন তৈরি করুন।
শুধু অন্যের নকশা অনুকরণ করলে দীর্ঘদিন আলাদা পরিচয় তৈরি করা কঠিন।
এর পাশাপাশি ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, হিসাব রাখা এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ শিখুন।
সবশেষে নিজের কাজের মূল্য নিজেকেই বুঝতে হবে।
প্রশ্ন: সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
সুচরিতা মণ্ডল: হাতে তৈরি পণ্য কিনলে শুধু দাম দেখবেন না, কাজের সময়টাও ভাবুন।
একটি নকশিকাঁথায় হয়তো কয়েক মাসের শ্রম রয়েছে। সেই শ্রমের মূল্য দেওয়া মানে শুধু একটি পণ্য কেনা নয়—একটি শিল্পচর্চাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করা।
আর পুরনো পারিবারিক কাঁথা থাকলে সেটিকে অবহেলা করবেন না। সেটি হয়তো আপনার পরিবারের এমন একটি ইতিহাস বহন করছে, যার আর কোনো লিখিত দলিল নেই।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন—নকশিকাঁথা কি ভবিষ্যতে টিকে থাকবে?
সুচরিতা মণ্ডল: আমি মনে করি টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার রূপ বদলাবে।
আগের মতো প্রতিটি পরিবারে কাঁথা তৈরি হবে—এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু প্রশিক্ষিত শিল্পী, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ডিজাইনার এবং নতুন বাজারের মাধ্যমে এই শিল্প নতুন রূপে এগিয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা যেন নকশিকাঁথাকে শুধু ‘গ্রামের পুরনো জিনিস’ হিসেবে না দেখি।
এটি হাতে তৈরি শিল্প। এটি পুনর্ব্যবহারের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। এটি নারীর সৃজনশীলতার প্রকাশ। এটি পারিবারিক স্মৃতির বাহক। আবার এটি একটি সম্ভাব্য জীবিকাও।
যে কাপড় একসময় ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হতে পারত, সেটিকে একজন নারী সূচ-সুতো দিয়ে নতুন জীবন দিয়েছেন। সেই ভাবনাটিই নকশিকাঁথার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
শেষকথা
নকশিকাঁথার প্রতিটি ফোঁড়ের মধ্যে হয়তো কোনো মহাকাব্য লেখা নেই, কিন্তু সেখানে থাকতে পারে একটি পরিবারের ছোট্ট গল্প। কোনো শিশুর জন্ম, কোনো বিয়ে, কোনো গ্রামের দৃশ্য, কোনো ফুলের স্মৃতি কিংবা নিছক সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা।
এই শিল্পের সৌন্দর্য এখানেই—এটি বড় ইতিহাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ইতিহাসও ধরে রাখে।
আধুনিক সময়ে নকশিকাঁথার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—কারিগরের দক্ষতা, ন্যায্য বাজার এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ।
পুরনো কাপড়কে নতুন জীবন দেওয়ার এই শিল্প যদি নতুন বাজারে নতুন ভাষা খুঁজে পায়, তাহলে নকশিকাঁথা শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; আগামী দিনের হস্তশিল্পেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
নোট: এই সাক্ষাৎকারের ব্যক্তি, বক্তব্য ও সংলাপ সম্পূর্ণ কাল্পনিক; সংবাদপোর্টালের ফিচার/সাক্ষাৎকার বিভাগে প্রকাশযোগ্য তথ্যভিত্তিক রচনাশৈলীতে নির্মিত।













Leave a Reply