পাহাড়ের গায়ে আঁকা অদৃশ্য মানচিত্র।

অভিরূপ পেশায় ভূতত্ত্বের ছাত্র। পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো তার নেশা। অচেনা পথ, পাথরের গঠন আর পুরোনো পাহাড়ি জনপদের ইতিহাস তাকে সবসময় টানত।

একবার উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে গবেষণার কাজে গিয়ে সে অদ্ভুত একটি জিনিস দেখতে পেল।

পাহাড়ের কালচে পাথরের গায়ে অসংখ্য আঁকিবুঁকি।

প্রথমে মনে হল, কোনো আদিবাসী শিল্পীর আঁকা ছবি।

কিন্তু কাছে গিয়ে অভিরূপ বুঝল—এগুলো আসলে রেখা।

কোথাও পাহাড়ের চিহ্ন, কোথাও নদীর মতো বাঁক, কোথাও ছোট ছোট বৃত্ত।

একটি রেখা বারবার একই জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে।

গ্রামের বৃদ্ধ গাইড মাধবকে সে জিজ্ঞেস করল,

“এগুলো কী?”

মাধব মুখ গম্ভীর করে বললেন,

“ওদিকে আর যেও না।”

“কেন?”

“ও পাহাড়ে পথ নেই।”

অভিরূপ হেসে বলল,

“মানচিত্রে তো পথ দেখা যাচ্ছে।”

মাধব কোনো উত্তর দিলেন না।

পরদিন সকালে অভিরূপ একাই সেই পাহাড়ের দিকে রওনা হল।

পাথরের আঁকাগুলোর সঙ্গে নিজের কম্পাস মিলিয়ে সে বুঝতে পারল, এগুলো কোনো সাধারণ ছবি নয়।

এগুলো একটি পুরোনো পথের মানচিত্র।

প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর সে একটি সরু গিরিখাতের সামনে পৌঁছল।

সেখানে পাথরের গায়ে একই চিহ্ন।

একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি দাগ।

অভিরূপ পাথর সরাতেই নিচে একটি ছোট ধাতব বাক্স দেখতে পেল।

বাক্স খুলে সে পেল একটি পুরোনো নোটবুক।

প্রথম পাতায় লেখা—

“এই পাহাড়ের নিচে শুধু পাথর নেই।”

লেখকের নাম—দেবাশিস সেন।

অভিরূপ নামটি চিনতে পারল।

দেবাশিস সেন ছিলেন বহু বছর আগে নিখোঁজ হওয়া এক ভূতত্ত্ববিদ।

তিনি এই অঞ্চলে গবেষণা করতে এসে আর ফেরেননি।

অভিরূপ দ্রুত পরের পাতাগুলো পড়তে লাগল।

দেবাশিস লিখেছিলেন, পাহাড়ের নিচে বিরল খনিজের সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কিছু ব্যবসায়ী গোপনে পাহাড় কেটে সেই খনিজ পাচার করছিল।

তিনি বিষয়টি প্রশাসনকে জানাতে চেয়েছিলেন।

শেষ পাতায় লেখা—

“যদি আমি ফিরতে না পারি, পাথরের মানচিত্রটাই সত্যের পথ দেখাবে।”

হঠাৎ বাইরে শব্দ হল।

অভিরূপ নোটবুক বন্ধ করে চুপ করে গেল।

দুজন লোক গিরিখাতের দিকে আসছে।

তাদের কথায় বোঝা গেল, তারা পাহাড়ের ভেতরের একটি পুরোনো সুড়ঙ্গ খুঁজছে।

অভিরূপ নিঃশব্দে অন্যদিকে সরে গেল।

পাথরের আড়ালে লুকিয়ে সে তাদের দেখল।

একজন বলল,

“পুরোনো লোকটা কোথায় বাক্স লুকিয়েছিল, সেটা খুঁজে বের করতেই হবে।”

অভিরূপ বুঝল, নোটবুকটি তাদেরই খোঁজার জিনিস।

সে ধীরে ধীরে গিরিখাতের অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে এল।

কিন্তু পাহাড়ের পথ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ তার পা পিছলে গেল।

সে নিচে পড়ে যাওয়ার আগে একটি গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরল।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে সে দেখল, ঠিক নিচেই একটি বিশাল পাথরের ফাঁক।

সেখানে সুড়ঙ্গের মুখ।

অভিরূপ নিচে নামল।

সুড়ঙ্গের ভেতর কয়েক মিটার এগোতেই সে পুরোনো কাঠের বাক্স, খনিজের নমুনা এবং কিছু কাগজ পেল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি ছোট ক্যামেরা।

ক্যামেরায় এখনও কয়েকটি ছবি ছিল।

ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেল—দেবাশিস সেন এবং কয়েকজন ব্যবসায়ী পাহাড়ের ভেতর খনিজ তুলছে।

শেষ ছবিতে দেবাশিস ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন।

তার হাতে একটি কাগজ।

তাতে লেখা—

“আমাকে যদি খুঁজে না পাও, এই ছবিগুলোকে খুঁজে নিও।”

অভিরূপ ক্যামেরাটি নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এল।

গ্রামে ফিরে সে মাধবকে সব জানাল।

বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল।

“দেবাশিসবাবু সত্যিই এসেছিলেন এখানে,” তিনি বললেন।

“আপনি জানতেন?”

“জানতাম। কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম।”

অভিরূপ এবার আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।

সব প্রমাণ প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হল।

তদন্তে বেআইনি খনিজ পাচারের বড় চক্রের সন্ধান মিলল।

পাহাড়ে খনন বন্ধ করা হল।

দেবাশিস সেনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিও নতুন করে তদন্ত শুরু হল।

কয়েক মাস পর পাহাড়ের সেই জায়গায় একটি ছোট ফলক বসানো হল—

“ড. দেবাশিস সেনের স্মৃতিতে—যিনি পাহাড়ের নীরবতার মধ্যেও সত্যের শব্দ শুনেছিলেন।”

অভিরূপ শেষবার যখন সেখানে গেল, তখন বিকেলের আলো পাহাড়ের গায়ে পড়েছে।

সেই পুরোনো রেখাগুলো এখনও দেখা যাচ্ছে।

সে হাত দিয়ে পাথর ছুঁয়ে মৃদু হাসল।

মানচিত্রটি আসলে কোনো গুপ্তধনের পথ দেখায়নি।

এটি দেখিয়েছিল সত্যের পথ।

আর সেই পথ অনুসরণ করার সাহস থাকলে, পাহাড়ও একদিন তার গোপন কথা বলে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *