বৃষ্টির দিনে যে সেতু তৈরি হয়েছিল।

বর্ষার প্রথম বড় বৃষ্টিতে শালবনপুর গ্রামের পুরোনো কালভার্টটি ভেঙে পড়ল। কালভার্টের ওপারেই ছিল ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় আর কয়েকটি বাড়ি। শুকনো দিনে খালের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যেত, কিন্তু বৃষ্টি নামলেই জল ফুলে উঠত। ফলে গ্রামের এক অংশের মানুষের সঙ্গে অন্য অংশের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যেত।

গ্রামের পঞ্চায়েত অফিসে বহুবার নতুন সেতুর দাবি জানানো হয়েছিল। কাগজপত্র তৈরি হয়েছে, মাপজোক হয়েছে, প্রতিশ্রুতিও এসেছে—কিন্তু কাজ শুরু হয়নি।

এবার বিপদটা ঘটল একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায়।

সেদিন দুপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত নার্স মাধবী খবর পেলেন, কালভার্টের ওপারের বাড়িতে এক বৃদ্ধের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু খালের জল এতটাই বেড়েছে যে অ্যাম্বুল্যান্স তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটেও পার হওয়া অসম্ভব।

মাধবী গ্রামের কয়েকজন যুবককে নিয়ে খালের ধারে পৌঁছলেন। সবাই উদ্বিগ্ন, কিন্তু কী করা যায় কেউ বুঝতে পারছিল না।

সেখানে দাঁড়িয়েই গ্রামের কাঠমিস্ত্রি নিতাই বলল, “আমরা যদি এখনই একটা অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা করি?”

কেউ হেসে উঠল। “এই বৃষ্টিতে? এত বড় খালের ওপর?”

নিতাই উত্তর দিল না। সে শুধু খালের দুপাশের মাটি, গাছের গুঁড়ি আর কাছের পুরোনো গুদামের কাঠগুলো দেখতে লাগল।

তার সঙ্গে যোগ দিল কলেজপড়ুয়া রূপা। সে স্কুলে পড়ার সময় বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ছোট সেতুর মডেল বানিয়েছিল। সে বলল, “কাঠ জুড়ে দিলেই হবে না। জলের স্রোত, ভার আর দুই পাশের মাটির শক্তি বুঝতে হবে। ভুল করলে আরও বড় বিপদ হতে পারে।”

গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অমলেন্দুবাবুকে খবর দেওয়া হলো। বয়সের কারণে তিনি খুব বেশি হাঁটতে পারতেন না, তবু লাঠিতে ভর দিয়ে খালের ধারে এলেন। পরিস্থিতি দেখে তিনি স্পষ্ট জানালেন, প্রবল স্রোতের ওপর নিজেরা তাড়াহুড়ো করে সেতু বানানো নিরাপদ নয়। তবে খালের অপেক্ষাকৃত সরু অংশে, জল কমার পর, বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অস্থায়ী উঁচু পথ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

বৃদ্ধের অবস্থা তখনও সংকটজনক। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ফোনে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জরুরি নির্দেশ দিলেন এবং বিকল্প উদ্ধারব্যবস্থার জন্য প্রশাসনকে জানালেন। গ্রামবাসীরা দড়ি, বাঁশ ও আলো নিয়ে প্রস্তুত থাকল, কিন্তু কেউ ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল জলে নামল না।

সন্ধ্যার আগে বিপর্যয় মোকাবিলা দলের কর্মীরা এসে পৌঁছলেন। তাঁদের সাহায্যে নিরাপদ উদ্ধারপথ তৈরি হলো। বৃদ্ধকে অন্য পারে নিয়ে যাওয়া গেল এবং সেখান থেকে হাসপাতালে পাঠানো হলো।

সেই রাতেই বৃষ্টি থামার পর গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নিল, শুধু বিপদ কাটলেই হবে না—সমস্যার স্থায়ী সমাধানও চাই।

পরের কয়েক দিন রূপা গ্রামের মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করল। কোন সময়ে জল বাড়ে, কোন পথে স্কুলের শিশুরা যাতায়াত করে, কতজন বৃদ্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল—সব লিখে রাখল। নিতাই কাঠ ও শ্রমের হিসাব দিল। অমলেন্দুবাবু নিরাপদ সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিলেন। পঞ্চায়েতের সদস্যরা সেই তথ্য নিয়ে প্রশাসনের কাছে নতুন করে আবেদন করলেন।

এবার আবেদনটি শুধু কয়েকটি স্বাক্ষর করা কাগজ ছিল না। তার সঙ্গে ছিল মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ, ছবি এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকৌশলীরা এসে জায়গাটি পরীক্ষা করলেন। প্রস্তাব তৈরি হলো, অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হলো এবং অবশেষে স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলো।

পরের বর্ষায় সেতুটি তৈরি হয়ে গেল।

উদ্বোধনের দিন গ্রামের মানুষ আনন্দে ভিড় করেছিল। কেউ ফুল নিয়ে এল, কেউ মিষ্টি। কিন্তু রূপা সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে অন্য কথা ভাবছিল। সে জানত, এই সেতু শুধু ইট, লোহা আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয়নি। এর ভিত গড়ে উঠেছিল মানুষের উদ্বেগ, পরস্পরের সহযোগিতা, সঠিক জ্ঞান এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের ওপর।

নিতাই পাশে এসে বলল, “সেদিন যদি আমরা তাড়াহুড়ো করে কিছু একটা বানিয়ে ফেলতাম, হয়তো বিপদ আরও বাড়ত।”

রূপা মৃদু হেসে বলল, “সাহস মানে সব সময় ঝুঁকি নেওয়া নয়। কখন থামতে হবে, কার সাহায্য নিতে হবে, আর কীভাবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে—সেটাও সাহস।”

সেতুর ওপর দিয়ে তখন স্কুলের শিশুরা দল বেঁধে হাঁটছিল। ওপারের বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছিলেন। আর গ্রামের মানুষ বুঝতে পারছিল, একটি সমস্যার সমাধান শুধু একজনের ক্ষমতায় হয় না। প্রয়োজন হয় অনেকের জ্ঞান, ধৈর্য এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধের।

শিক্ষা: বিপদের সময় আবেগের বশে ঝুঁকি নেওয়া নয়, বিচক্ষণতা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং সম্মিলিত উদ্যোগই স্থায়ী সমাধানের পথ দেখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *