যে বীজের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায়নি।

বাঁকুড়ার ছোট্ট গ্রাম শিমুলডাঙায় কৃষক হরিপদ মণ্ডল সারা জীবন ধান চাষ করেছেন। তাঁর বাবা, ঠাকুরদা—সকলেই ছিলেন কৃষক। তাঁদের কাছে চাষ শুধু জীবিকা ছিল না, ছিল মাটির সঙ্গে সম্পর্কের এক গভীর উত্তরাধিকার।

হরিপদের বাড়ির পিছনে ছিল একটি পুরোনো মাটির ঘর। ঘরের এক কোণে কাঠের বাক্সে রাখা থাকত বিভিন্ন ধরনের ধানের বীজ। কিছু বীজের নাম তিনি জানতেন, কিছু বীজের নাম শুধু তাঁর বাবাই জানতেন। বাবা বলতেন, “সব বীজ এক রকম নয় রে। কোনোটা কম জলে বাঁচে, কোনোটা অতিরিক্ত বৃষ্টি সহ্য করে, আবার কোনোটা খরার সময়েও পুরোপুরি হার মানে না।”

হরিপদ তখন এসব কথার গুরুত্ব বুঝতেন না। বাজারে যে বীজে বেশি ফলন হয়, সেটাই তাঁর কাছে ভালো বীজ ছিল।

সময় বদলাল। গ্রামের অনেক কৃষক নতুন জাতের বীজ ব্যবহার করতে শুরু করলেন। ফলনও বাড়ল। হরিপদও পুরোনো বাক্সের বীজ সরিয়ে রেখে আধুনিক বীজ কিনতে লাগলেন। কয়েক বছরের মধ্যে মাটির ঘরটি অপ্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জায়গায় পরিণত হলো।

একদিন তাঁর মেয়ে তিথি কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে ঘরটি পরিষ্কার করতে গিয়ে কাঠের বাক্সটি খুঁজে পেল।

বাক্সের ভিতরে কাপড়ে মোড়ানো ছোট ছোট পুঁটলি। প্রতিটি পুঁটলির সঙ্গে কাগজে লেখা কিছু নাম, চাষের সময় এবং বীজের বিশেষ গুণ। কয়েকটি কাগজে হরিপদের বাবার হাতের লেখা।

তিথি কৃষিবিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল। সে বুঝতে পারল, বাক্সের বীজগুলো শুধু পুরোনো স্মৃতি নয়; সেগুলো স্থানীয় কৃষিবৈচিত্র্যের মূল্যবান সম্পদও হতে পারে।

সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “এই বীজগুলো দিয়ে আবার চাষ করা যায় না?”

হরিপদ হেসে বললেন, “এত বছরের পুরোনো বীজ! এগুলো দিয়ে আর কী হবে? এখনকার চাষে বাজারের বীজই ভালো।”

তিথি জেদ করল না। সে প্রথমে কলেজের এক অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলল। অধ্যাপক জানালেন, বীজগুলো সংরক্ষণের আগে তাদের পরিচয়, অঙ্কুরোদ্গমের ক্ষমতা এবং রোগমুক্ত থাকার বিষয়টি পরীক্ষা করা দরকার। শুধু পুরোনো বলেই কোনো বীজকে উপকারী ধরে নেওয়া যাবে না।

তিথি কয়েকটি নমুনা নিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করল। দেখা গেল, কিছু বীজ নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা কম, কিন্তু কয়েকটি নমুনা এখনও জীবিত।

এই খবর শুনে হরিপদ প্রথমবারের মতো বাক্সটির দিকে নতুন চোখে তাকালেন।

পরের মরসুমে কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে গ্রামের একটি ছোট জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হলো। জমির এক অংশে প্রচলিত ধানের জাত, অন্য অংশে নির্বাচিত পুরোনো জাত লাগানো হলো। চাষের খরচ, জলের প্রয়োজন, রোগের প্রকোপ এবং ফলন—সবকিছুর হিসাব রাখা হলো।

প্রথম দিকে অনেকে ঠাট্টা করেছিল।

“পুরোনো দিনের বীজ দিয়ে আধুনিক চাষ হবে নাকি?”

কিন্তু বর্ষার মাঝামাঝি আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিল। কিছু জমিতে জল জমে রইল, আবার কিছু জমিতে বৃষ্টির দীর্ঘ বিরতি দেখা গেল। পরীক্ষামূলক জমির একটি পুরোনো ধানের জাত তুলনামূলকভাবে কম জলের পরিস্থিতিতে ভালোভাবে টিকে রইল। অন্য একটি জাতের ফলন আশানুরূপ হলো না।

তিথি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েনি। সে জানত, একটি মরসুমের ফলাফল দিয়েই কোনো জাত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আরও পরীক্ষা, আরও তথ্য এবং বিভিন্ন জমিতে চাষের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

তবে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ল। গ্রামের কয়েকজন চাষি পরের বছর পরীক্ষায় অংশ নিতে চাইলেন। কৃষি দপ্তরের সহায়তায় বীজগুলোর পরিচয় নথিভুক্ত করা হলো এবং উপযুক্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো।

একদিন পাশের গ্রামের এক ব্যবসায়ী হরিপদের কাছে এলেন। তিনি সব বীজ একসঙ্গে কিনে নিতে চাইলেন। ভালো দাম দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিলেন।

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “বীজ বিক্রি করতেই পারি। কিন্তু সব বীজ এক জায়গায় চলে গেলে আমাদের গ্রামের হাতে আর কিছু থাকবে না। আগে এগুলোর সঠিক পরিচয় আর সংরক্ষণের ব্যবস্থা হোক।”

ব্যবসায়ী বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু হরিপদ নিজের সিদ্ধান্তে স্থির রইলেন।

পরের বছর গ্রামে একটি ছোট বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠল। কৃষকেরা নিজেদের অঞ্চলের পুরোনো বীজের নমুনা, চাষের অভিজ্ঞতা এবং ফলনের তথ্য সেখানে জমা দিতে লাগলেন। বীজ বিনিময়ের ব্যবস্থাও চালু হলো, তবে প্রতিটি বীজের পরিচয় ও উৎস নথিভুক্ত করার নিয়ম রাখা হলো।

উদ্বোধনের দিন হরিপদ কাঠের বাক্সটি নিয়ে এলেন। বাক্সের ঢাকনায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমার বাবা এগুলো রেখে গিয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম, এগুলোর আর কোনো দাম নেই। আজ বুঝছি, সব মূল্য বাজারে মাপা যায় না।”

তিথি বাবার হাত ধরল।

সেদিন সে বুঝেছিল, উত্তরাধিকার মানে শুধু পূর্বপুরুষের জিনিস আগলে রাখা নয়। তার মধ্যে কোন জ্ঞান আজও কাজে লাগতে পারে, কোনটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে এবং কোনটা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি—সেই বিচার করাও উত্তরাধিকারের অংশ।

কাঠের বাক্সটি এবার আর অন্ধকার ঘরের কোণে পড়ে রইল না। সেটি স্থান পেল গ্রামের বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্রের একটি তাকে। পাশে লেখা হলো—‘প্রতিটি বীজের ইতিহাস জানুন, সংরক্ষণ করুন, তারপর ব্যবহার করুন।’

শিক্ষা: পুরোনো জ্ঞানকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা অবহেলা—কোনোটিই ঠিক নয়। পরীক্ষা, বিজ্ঞানসম্মত বিচার এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *