
নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম চরনবীপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্ভর করত মাছ ধরা, চাষবাস আর নদী পারাপারের ওপর। নদীর ওপারে ছিল বড় বাজার, হাসপাতাল এবং উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। তাই প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নদীতে নৌকা চলত।
এই নৌকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ছিল ‘মা মনসা’। নৌকাটির মাঝি ছিলেন আব্দুল করিম। প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি মানুষকে নদী পার করিয়েছেন। তাঁর হাতের বৈঠা আর নদীর স্রোত যেন একে অপরকে চিনত।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করিমের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তাঁর ছেলে রফিক চাইত, বাবা এবার বিশ্রাম নিন। সে নিজেই নৌকা চালাতে পারবে। কিন্তু করিমের মনে হতো, নৌকাটি ছেড়ে দিলে জীবনের একটা বড় অংশ যেন হারিয়ে যাবে।
একদিন বিকেলে আকাশের চেহারা হঠাৎ বদলে গেল। কালো মেঘ জমল, বাতাসের গতি বাড়ল। নদীর জল দ্রুত ফুলে উঠতে লাগল। অন্য মাঝিরা একে একে নৌকা তুলে ঘাটে বেঁধে দিলেন।
কিন্তু সেদিন ওপারের বাজারে আটকে পড়েছিল কয়েকজন মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, দুই বৃদ্ধ এবং একটি ছোট মেয়ে। শেষ বাস চলে যাওয়ার আগে তাঁদের এপারে ফিরতে হবে। ঘাটে খবর এসে পৌঁছতেই কয়েকজন করিমের কাছে ছুটে এল।
“চাচা, আপনার নৌকাটা নিয়ে একবার চলুন না! ওরা ওপারে আটকে আছে।”
করিম নদীর দিকে তাকালেন। স্রোত অস্বাভাবিক দ্রুত। বাতাসের ধাক্কায় ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলোও দুলছে।
তাঁর ভিতরে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। এত বছর ধরে মানুষকে সাহায্য করেছেন তিনি। আজ বিপদের সময় ফিরে দাঁড়ালে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন না তো?
রফিক বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, তিনি কী ভাবছেন।
সে বলল, “বাবা, মানুষকে ফিরিয়ে আনা জরুরি। কিন্তু এই অবস্থায় নৌকা নিয়ে গেলে সবাই বিপদে পড়তে পারে।”
করিম বিরক্ত হয়ে বললেন, “তুই নদীকে আমার চেয়ে বেশি চিনিস?”
রফিক শান্ত গলায় উত্তর দিল, “না বাবা। কিন্তু নদীকে চেনা মানে নদীকে হারিয়ে দেওয়া নয়। কখন সে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, সেটাও বুঝতে হয়।”
কথাটা করিমের মনে লাগল। তিনি আবার নদীর দিকে তাকালেন। বহু বছর আগে তাঁর বাবা তাঁকে শিখিয়েছিলেন, নদীতে সাহস দেখানোর চেয়ে নদীর সংকেত বুঝতে শেখা বেশি জরুরি।
করিম সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অবস্থায় নৌকা নিয়ে বেরোবেন না। তিনি ঘাটের লোকদের দিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করালেন। ওপারের মানুষদেরও ফোনে জানানো হলো, যেন তাঁরা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকেন এবং নদীর ধারে না আসেন।
কিন্তু অপেক্ষা করা সহজ ছিল না। অন্ধকার নেমে এল। বৃষ্টি শুরু হলো। ঘাটে দাঁড়িয়ে করিম বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের কাজ থেকে পালিয়ে এসেছেন।
কিছুক্ষণ পরে খবর এল, ওপারের মানুষদের একটি পাকা ভবনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে পৌঁছেছেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে উদ্ধারকর্মীরা তাঁদের নিরাপদে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন।
সারা রাত করিম ঘাটে থাকলেন। তিনি শুধু নিজের নৌকাটিই দেখলেন না, অন্য নৌকাগুলোর বাঁধনও পরীক্ষা করলেন। কয়েকজন যুবককে নিয়ে ঘাটের বিপজ্জনক অংশে দড়ি ও সতর্কতামূলক চিহ্ন লাগালেন, যাতে কেউ অন্ধকারে ভুল করে নদীতে নেমে না পড়ে।
পরদিন সকালে ঝড়ের তীব্রতা কমলে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হলো। অন্তঃসত্ত্বা নারীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর পরিবার করিমের কাছে এসে কৃতজ্ঞতা জানাল।
নারীটির স্বামী বললেন, “আপনি যদি গতকাল নৌকা নিয়ে আসতেন, হয়তো আমরাও আপনাকে হারাতাম। আপনি না এসেও আমাদের সাহায্য করেছেন।”
করিম কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখ নদীর দিকে চলে গেল।
কয়েক দিন পরে রফিক নৌকাটির কাঠ পরীক্ষা করে বলল, “বাবা, নৌকাটা মেরামত করতে হবে। আর নিরাপত্তার জন্য নতুন ব্যবস্থা করতে হবে। আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট—সবই দরকার।”
করিম সম্মতি জানালেন। এবার তিনি ছেলের সঙ্গে বসে নৌকার খরচের হিসাব করলেন। গ্রামের অন্য মাঝিদেরও ডাকা হলো। তাঁরা ঠিক করলেন, ঝড়ের সতর্কতা জারি হলে যাত্রী পারাপার বন্ধ থাকবে এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হবে।
মাসখানেক পরে ‘মা মনসা’ আবার নদীতে নামল। নৌকার গায়ে নতুন রং লাগানো হয়েছে, যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট। করিম বৈঠা হাতে দাঁড়ালেন, আর রফিক নৌকার সামনে আবহাওয়ার খবর পরীক্ষা করল।
প্রথম যাত্রার আগে করিম ছেলেকে বললেন, “এত দিন ভাবতাম, মাঝির কাজ মানুষকে ওপারে পৌঁছে দেওয়া। এখন বুঝেছি, কখন যাত্রা শুরু করতে হবে আর কখন থামতে হবে—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
নদী তখন শান্ত। নৌকাটি ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে এগিয়ে চলল।
করিম জানতেন, নদীকে কখনো পুরোপুরি বশ করা যায় না। কিন্তু অভিজ্ঞতা, সতর্কতা আর দায়িত্ববোধ থাকলে নদীর সঙ্গে নিরাপদে পথ চলা যায়।
শিক্ষা: প্রকৃত সাহস মানে সব বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া নয়। পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অন্যের নিরাপত্তাকে নিজের অহংকারের চেয়ে বড় করে দেখাই প্রকৃত সাহসিকতা।












Leave a Reply