
একসময় বাংলার গ্রামবাংলায় বিকেল নামলেই বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরীরা নিজেদের মতো করে খেলার আসর বসাত। কোনো খেলায় লাগত কড়ি, কোনো খেলায় পাথরকুচি, আবার কোনো খেলায় প্রয়োজন হতো শুধু একটি খোলা উঠোন ও কয়েকজন বন্ধু।
সেই হারিয়ে যেতে বসা লোকজ খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এলাটিং বেলাটিং। এটি ছিল ছড়া ও দলগত শারীরিক কৌশলের এক অভিনব মিশ্রণ। সাধারণত দুই দল মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছড়ার প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে খেলা এগিয়ে নিয়ে যেত। শেষ পর্যায়ে শুরু হতো প্রতিপক্ষ দলের একজন খেলোয়াড়কে নিজেদের দলে টেনে নেওয়ার চেষ্টা। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে খেলাটির নিয়ম ও ছড়ার কিছু পার্থক্যও দেখা যায়।
খেলার শুরু কীভাবে?
খেলার জন্য প্রথমে খেলোয়াড়দের দুটি দলে ভাগ করা হতো।
দুই দল মুখোমুখি হয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়াত। মাঝখানে একটি কাল্পনিক বা মাটিতে আঁকা সীমারেখা থাকত।
এরপর এক দল কয়েক পা এগিয়ে এসে ছড়ার একটি অংশ বলত। অন্য দল তার উত্তর দিত।
এই প্রশ্নোত্তর চলতে থাকত।
খেলার একটি প্রচলিত ছড়ার ধরন ছিল—
‘এলাটিং বেলাটিং সইলো’,
তারপর অন্য দল জিজ্ঞাসা করত—
‘কীসের খবর আইলো?’
এরপর রাজা, বালিকা এবং তাকে নিয়ে যাওয়ার কথোপকথনের মাধ্যমে ছড়া এগিয়ে যেত। বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়ার শব্দ ও পরবর্তী অংশে পরিবর্তন দেখা যেত।
ছড়াই ছিল খেলার প্রাণ
এলাটিং বেলাটিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল এর ছড়া।
সাধারণ কোনো দৌড়ের খেলার মতো এখানে শুরুতেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যেত না। প্রথমে তৈরি হতো ছন্দময় কথোপকথনের পরিবেশ।
এক দল প্রশ্ন করত, অন্য দল উত্তর দিত।
কোনো কোনো সংস্করণে কার নাম চাওয়া হবে, কী পরে যাবে, কীসে করে যাবে—এমন নানা প্রশ্নোত্তর ছড়ার অংশ হয়ে উঠত।
ফলে খেলাটি শুধু শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করত না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্মৃতি, ছন্দ এবং দলগত অভিনয়ও।
শেষ পর্যায়ে শুরু হতো আসল উত্তেজনা
ছড়ার শেষ পর্যায়ে খেলার চরিত্র বদলে যেত।
একটি দল প্রতিপক্ষের নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড়কে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করত।
অন্য দল তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করত।
এই টানাটানির মধ্যেই নির্ধারিত হতো কোন দল সফল হলো।
অর্থাৎ খেলার শুরুটা ছিল শান্ত ও ছন্দময়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা পরিণত হতো উত্তেজনাপূর্ণ দলগত প্রতিযোগিতায়।
কেন এত জনপ্রিয় ছিল?
এলাটিং বেলাটিংয়ের বিশেষত্ব ছিল—একটি খেলায় একাধিক ধরনের আনন্দ পাওয়া যেত।
প্রথমে ছিল ছড়া।
তারপর ছিল প্রশ্নোত্তর।
এরপর ছিল দলগত কৌশল।
সবশেষে ছিল টানাটানি ও জয়ের উত্তেজনা।
ফলে একই খেলায় যারা গান বা ছড়া বলতে ভালোবাসত, তারাও অংশ নিতে পারত; আবার যারা শারীরিক প্রতিযোগিতা পছন্দ করত, তারাও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারত।
দলগত সম্পর্ক তৈরি করত
খেলাটিতে একা ভালো খেললেই জয় সম্ভব ছিল না।
নিজের দলের অন্য সদস্যকে ধরে রাখা, সঠিক সময়ে এগিয়ে যাওয়া এবং সবাই মিলে প্রতিপক্ষকে সামলানো—এসবের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা দরকার হতো।
এই কারণেই এলাটিং বেলাটিং ছিল সামাজিক যোগাযোগ ও দলগত অংশগ্রহণের একটি ভালো উদাহরণ।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকখেলা নিয়ে গবেষণাতেও এই ধরনের খেলাকে সামাজিকীকরণ, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
গ্রামের উঠোন ছিল খেলার মাঠ
এলাটিং বেলাটিং খেলার জন্য আধুনিক মাঠ বা বিশেষ সরঞ্জামের দরকার হতো না।
বাড়ির বড় উঠোন, পাড়ার খোলা জায়গা কিংবা গ্রামের ফাঁকা মাঠ—যেকোনো নিরাপদ জায়গাতেই খেলা সম্ভব ছিল।
এই সহজলভ্যতাই ছিল লোকজ খেলাগুলোর অন্যতম শক্তি।
একটি রেখা টেনে দুই দল দাঁড়িয়ে গেলেই খেলার পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত।
ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা পুরনো সমাজের ছবি
এলাটিং বেলাটিংয়ের ছড়া শুধু খেলার শব্দ ছিল না। এর মধ্যে পুরনো বাংলার সামাজিক কল্পনা, পোশাক, পালকি, অর্থ এবং বিয়ের মতো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।
গবেষক ও লেখকেরা এই ছড়ার মধ্যে পুরনো সামাজিক জীবনের নানা প্রতিফলন খুঁজে দেখেছেন।
তাই খেলাটিকে শুধু শিশুদের বিনোদন হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক দিকটি সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
মুখে মুখে বেঁচে ছিল খেলা
লোকজ খেলাগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—এসবের নিয়ম বই পড়ে শেখা হতো না।
এক প্রজন্মের শিশুরা অন্য প্রজন্মের শিশুদের দেখে শিখত।
একইভাবে ছড়াও মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত।
ফলে কোনো এলাকার এলাটিং বেলাটিংয়ের ছড়া অন্য এলাকার তুলনায় কিছুটা আলাদা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই মৌখিক ঐতিহ্যই একদিকে খেলাটিকে জীবন্ত রেখেছিল, অন্যদিকে লিখিত সংরক্ষণ না থাকায় অনেক স্থানীয় সংস্করণ হারিয়েও গেছে।
কেন আজ আর তেমন দেখা যায় না?
সময়ের সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
খোলা জায়গা কমেছে। শিশুদের অবসর কাটানোর ধরন বদলেছে। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ভিডিও গেম নতুন ধরনের বিনোদন নিয়ে এসেছে।
বাংলার লোকজ খেলাগুলো নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আধুনিক প্রযুক্তি ও খেলার মাঠের অভাবকে ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর হারিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এলাটিং বেলাটিংয়ের মতো খেলাগুলো এখন অনেকের কাছে শুধু স্মৃতি।
স্কুলে ফিরতে পারে এলাটিং বেলাটিং
এই খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করানোর একটি উপায় হতে পারে স্কুলের লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠান।
শিক্ষার্থীদের দুটি দলে ভাগ করে ছড়ার অংশ শেখানো যেতে পারে। তবে পুরনো খেলাটির শারীরিক টানাটানি অংশটি আধুনিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পরিবর্তন করা ভালো।
উদাহরণ হিসেবে, টানাটানির পরিবর্তে নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করার প্রতীকী প্রতিযোগিতা রাখা যেতে পারে।
তাতে খেলাটির ছড়া, দলগত ভাবনা ও ঐতিহ্য বজায় থাকবে, কিন্তু আঘাতের ঝুঁকি কমবে।
খেলাটির ছড়া সংরক্ষণ জরুরি
এলাটিং বেলাটিংয়ের মতো খেলাগুলো সংরক্ষণ করতে হলে শুধু খেলার নাম লিখে রাখলেই হবে না।
যে অঞ্চলে যে ছড়া প্রচলিত ছিল, সেটিও সংগ্রহ করা দরকার।
প্রবীণ মানুষদের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানা যেতে পারে—
- তাঁদের এলাকায় খেলাটির নাম কী ছিল।
- কতজন খেলোয়াড় অংশ নিত।
- ছড়াটি কীভাবে বলা হতো।
- কোথায় খেলা হতো।
- কোন বয়সের ছেলেমেয়েরা খেলত।
- খেলার শেষে কীভাবে বিজয়ী নির্ধারণ করা হতো।
এভাবে তৈরি হতে পারে বাংলার লোকজ খেলাধুলার একটি মূল্যবান আর্কাইভ।
নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
মূল খেলায় প্রতিপক্ষকে টেনে নেওয়ার অংশ থাকায় বর্তমানে এটি আয়োজন করলে যথেষ্ট সতর্কতা দরকার।
কেউ যেন হাত, কাঁধ বা পোশাকে জোরে টান না দেয়। ধাক্কাধাক্কি, মাটিতে ফেলে দেওয়া বা বিপজ্জনকভাবে টানাটানি করা উচিত নয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের তত্ত্বাবধান থাকা জরুরি।
প্রয়োজনে আসল টানাটানির বদলে নিরাপদ প্রতীকী নিয়ম ব্যবহার করা যেতে পারে।
হারিয়ে যাওয়া খেলার মূল্য
এলাটিং বেলাটিং আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পুরনো দিনের খেলাগুলো কতটা সৃজনশীল ছিল।
একটি ছড়া দিয়ে শুরু, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া, তারপর দলগত প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল বিনোদনের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতিরও বাহক।
আজকের দিনে হয়তো সেই খেলা আগের মতো পাড়ায় পাড়ায় দেখা যায় না। কিন্তু এর ছড়া, নাম ও নিয়ম সংরক্ষণ করা গেলে বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেঁচে থাকবে।
উপসংহার
এলাটিং বেলাটিং শুধু একটি পুরনো খেলার নাম নয়; এটি বাংলার এক সময়ের সামাজিক জীবনের স্মৃতি।
ছড়ার শব্দে ছিল আনন্দ, দুই দলের মুখোমুখি দাঁড়ানোয় ছিল উত্তেজনা, আর শেষ মুহূর্তের প্রতিযোগিতায় ছিল জয়ের আনন্দ।
সময়ের সঙ্গে খেলার মাঠ বদলেছে, শিশুদের বিনোদন বদলেছে। কিন্তু পুরনো এই খেলাগুলোর স্মৃতি এখনও আমাদের লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারে জীবন্ত।
একটি ছড়া, দুটি দল আর কয়েকজন শিশুর হাসি—এই সামান্য উপকরণেই একসময় বাংলার উঠোনে তৈরি হতো এক বিশাল আনন্দের পৃথিবী।












Leave a Reply