
শহরের পুরোনো মহকুমা হাসপাতালে প্রতিদিন সকাল থেকেই রোগীদের ভিড় জমত। কেউ দূর গ্রামের বাসিন্দা, কেউ দিনমজুর, কেউ আবার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষ। চিকিৎসকের সংখ্যা সীমিত, পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাপ বেশি। ফলে অনেক রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে কাজ করতেন অনিরুদ্ধ সেন। তিনি চিকিৎসক ছিলেন না; তাঁর দায়িত্ব ছিল রোগীদের নাম নথিভুক্ত করা, কাগজপত্র তৈরি করা এবং নির্দিষ্ট বিভাগে পাঠানো। কাজটি বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও, প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড় সামলাতে গিয়ে তিনি প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।
একদিন সকালে এক বৃদ্ধা তাঁর কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ, ভিতরে কিছু রিপোর্ট আর ওষুধের খালি পাতা।
বৃদ্ধা বললেন, “বাবা, আমার ছেলেটা বাইরে কাজ করে। আমি একাই এসেছি। কোন ঘরে যেতে হবে বুঝতে পারছি না।”
অনিরুদ্ধ তখন একসঙ্গে কয়েকজনের কাগজ সামলাচ্ছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওই বোর্ডটা পড়ুন। সব লেখা আছে।”
বৃদ্ধা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেখানে বিভিন্ন বিভাগের নাম, কক্ষ নম্বর এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ লেখা ছিল। কিন্তু ছোট অক্ষর, কঠিন চিকিৎসা-সংক্রান্ত শব্দ আর ভিড়ের মধ্যে তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না।
তিনি চুপচাপ সরে গেলেন।
দুপুরের দিকে অনিরুদ্ধ দেখলেন, বৃদ্ধা এখনও করিডরে বসে আছেন। তাঁর হাতে সেই একই কাগজপত্র। তিনি বুঝতে পারলেন, বৃদ্ধা হয়তো সঠিক বিভাগে পৌঁছতেই পারেননি।
অনিরুদ্ধ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি এখনও দেখাতে পারেননি?”
বৃদ্ধা মাথা নেড়ে বললেন, “কোন ঘরে যাব বুঝতে পারিনি। আবার কাউকে জিজ্ঞেস করতেও ভয় লাগছিল। সবাই এত ব্যস্ত!”
কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ অস্বস্তি বোধ করলেন। হাসপাতালটি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তৈরি, অথচ সেখানে পৌঁছে একজন মানুষ পথ হারিয়ে বসে আছেন।
সেদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় তাঁর মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরছিল—হাসপাতালের কর্মীরা কি সত্যিই রোগীদের সময় বাঁচাতে সাহায্য করছেন, নাকি ব্যবস্থার জটিলতাই তাঁদের সময় কেড়ে নিচ্ছে?
পরদিন তিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলেন। দেখলেন, অনেক রোগী ভুল বিভাগে চলে যাচ্ছেন। কেউ পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্ট কোথায় জমা দেবেন জানেন না। কেউ আবার একটি কাগজে সই করাতে তিনটি কাউন্টার ঘুরছেন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, তথ্য ছিল ঠিকই, কিন্তু তা রোগীদের বোঝার উপযোগী করে সাজানো ছিল না।
অনিরুদ্ধ তাঁর ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের কাছে একটি প্রস্তাব রাখলেন। হাসপাতালের প্রবেশপথে একজন করে প্রশিক্ষিত সহায়ক থাকবেন, যিনি রোগীদের প্রয়োজন বুঝে সঠিক বিভাগে পাঠাবেন। বিভিন্ন বিভাগের নাম ও কক্ষ নম্বর বড় অক্ষরে লেখা হবে। যাঁরা পড়তে পারেন না, তাঁদের জন্য থাকবে মৌখিক নির্দেশনা। বয়স্ক ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
প্রথমে প্রস্তাবটি খুব গুরুত্ব পেল না।
একজন কর্মী বললেন, “আমাদের হাতে এমনিতেই কাজের অভাব নেই। নতুন ব্যবস্থা চালু করলে আরও ঝামেলা বাড়বে।”
অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন, “প্রথমে কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু রোগীরা ভুল জায়গায় ঘুরে বেড়ানো বন্ধ করলে আমাদেরও কাজ কমবে।”
তিনি হাসপাতালের কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা শুরু করলেন। প্রবেশপথে একটি টেবিল রাখা হলো। সেখানে দুজন কর্মী রোগীদের কাগজ দেখে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন, কোথায় যেতে হবে এবং কী কী নথি সঙ্গে রাখতে হবে।
কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবর্তন চোখে পড়ল। ভুল বিভাগে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমল। একই প্রশ্নের উত্তর দিতে বিভিন্ন কাউন্টারের কর্মীদের বারবার কাজ থামাতে হচ্ছিল না। রোগীরাও আগের তুলনায় কম বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন।
তবে সব সমস্যা একসঙ্গে মিটে যায়নি। চিকিৎসকের ঘাটতি ছিল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হতো, জরুরি বিভাগের চাপও কমেনি। অনিরুদ্ধ জানতেন, শুধু নির্দেশনা ভালো করলেই হাসপাতালের সব সংকট দূর হবে না। তবু যে সমস্যার সমাধান সম্ভব, সেটিকে অবহেলা করার কোনো কারণ নেই।
কয়েক সপ্তাহ পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উদ্যোগটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করলেন। নতুন নির্দেশনামূলক বোর্ড বসানো হলো। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো, আর রোগীদের মতামত জানানোর জন্য একটি সহজ ব্যবস্থা তৈরি হলো।
একদিন সেই বৃদ্ধা আবার হাসপাতালে এলেন। এবার তিনি প্রবেশপথের সহায়কের কাছে নিজের কাগজপত্র দেখালেন এবং নির্দিষ্ট বিভাগে চলে গেলেন।
ফেরার সময় অনিরুদ্ধকে দেখে তিনি থামলেন।
“বাবা, আজ আর আমাকে ঘুরতে হয়নি। তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। আমার নাতিটা একা আছে।”
অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “এবার থেকে কাউকে একা একা পথ খুঁজতে হবে না, যতটা সম্ভব আমরা সাহায্য করব।”
বৃদ্ধা চলে যাওয়ার পর তিনি কাউন্টারের দিকে তাকালেন। একই ভিড়, একই ব্যস্ততা, একই সীমাবদ্ধতা। কিন্তু মানুষের মুখে অস্থিরতার বদলে কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছিল।
অনিরুদ্ধ বুঝলেন, সব সময় বড় যন্ত্র, নতুন ভবন কিংবা বিপুল অর্থই পরিবর্তনের একমাত্র পথ নয়। কখনও কখনও মানুষের সময়ের মূল্য বুঝে নেওয়া এবং একটি জটিল ব্যবস্থাকে একটু সহজ করে দেওয়াই অনেক বড় কাজ।
হাসপাতালটি রোগীদের কাছ থেকে সত্যিই সময় ধার নিয়েছিল। কিন্তু এবার সেই সময়ের কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
শিক্ষা: মানুষের সময় ও মর্যাদার মূল্য বোঝা একটি বড় মানবিক গুণ। ছোট, বাস্তবসম্মত পরিবর্তনও বহু মানুষের কষ্ট কমিয়ে দিতে পারে।












Leave a Reply