
Eশীতকাল অনেকের কাছেই আনন্দের ঋতু। ঠান্ডা আবহাওয়া, মিঠে রোদ, পিকনিক, ভ্রমণ এবং নানা রকম শীতের খাবার এই ঋতুকে বিশেষ করে তোলে। কিন্তু শীতের সময় অনেক মানুষ নাক দিয়ে জল পড়া, বারবার হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, চোখ চুলকানো, গলায় অস্বস্তি কিংবা ত্বকে চুলকানির মতো সমস্যায় ভোগেন। কারও ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলি সাধারণ সর্দির কারণে হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ধুলোবালি, ছত্রাক, ধোঁয়া বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তাই শীতকালে সুস্থ থাকতে হলে অ্যালার্জির কারণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, সব ধরনের হাঁচি বা নাক দিয়ে জল পড়াই অ্যালার্জি নয়। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শীতকালে অ্যালার্জির সমস্যা কেন বাড়ে?
শীতকালে আবহাওয়া শুষ্ক হয়ে যাওয়া, বাতাসে ধুলোবালির উপস্থিতি, ঘরের দরজা-জানালা দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা এবং কম্বল, লেপ ও পুরোনো শীতবস্ত্রে জমে থাকা ধুলোর কারণে অনেকের অ্যালার্জির সমস্যা বাড়তে পারে। ঘরের স্যাঁতসেঁতে অংশে ছত্রাক জন্মালেও তা অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঠান্ডা বাতাস সরাসরি নাকের ভেতরের আবরণকে উত্তেজিত করে। ফলে হাঁচি, নাক দিয়ে জল পড়া বা নাক বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একে সব সময় অ্যালার্জি বলা যায় না; কখনও এটি ঠান্ডা বাতাসের কারণে হওয়া নাকের প্রদাহও হতে পারে।
অ্যালার্জির সাধারণ লক্ষণগুলি কী কী?
শীতকালে অ্যালার্জির ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়।
১. একটানা বা বারবার হাঁচি হওয়া।
২. নাক দিয়ে স্বচ্ছ জল পড়া।
৩. নাক, চোখ বা গলায় চুলকানি অনুভব করা।
৪. নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নাকের ভেতর অস্বস্তি হওয়া।
৫. চোখ লাল হওয়া বা চোখ দিয়ে জল পড়া।
৬. ত্বকে চুলকানি কিংবা কিছু ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া।
৭. রাতে নাক বন্ধ থাকার কারণে ঘুমের সমস্যা হওয়া।
তবে জ্বর, শরীরব্যথা, তীব্র গলাব্যথা বা অসুস্থ বোধ করার মতো উপসর্গ থাকলে ভাইরাসজনিত সংক্রমণসহ অন্য কারণও বিবেচনা করতে হবে।
লেপ, কম্বল ও শীতের পোশাক পরিষ্কার রাখুন
শীত শুরু হওয়ার আগে আলমারি থেকে বের করা লেপ, কম্বল, চাদর ও গরম পোশাক ভালোভাবে পরিষ্কার করা দরকার। দীর্ঘদিন বন্ধ অবস্থায় রাখা এসব জিনিসে ধুলো জমতে পারে। ধুলো সংবেদনশীল মানুষের ক্ষেত্রে এটি হাঁচি বা নাকের অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
সম্ভব হলে কম্বল ও চাদর নিয়মিত ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে ব্যবহার করুন। ধোয়া সম্ভব না হলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশ অনুযায়ী পরিষ্কার করুন। রোদে দেওয়া সহায়ক হতে পারে, তবে শুধু রোদে দিলেই সব অ্যালার্জেন দূর হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিছানার চাদর নিয়মিত বদলান। শোবার ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং পরিষ্কার করার সময় অতিরিক্ত ধুলো যেন বাতাসে না ওড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন
শীতকালে ঠান্ডা এড়াতে অনেকেই সারাদিন জানালা বন্ধ রাখেন। কিন্তু ঘরের ভেতরে ধুলো, ধোঁয়া, রান্নার গন্ধ ও অন্যান্য বিরক্তিকর কণা জমে থাকতে পারে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে কিছু সময়ের জন্য জানালা খুলে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
ঘরে ধূমপান করবেন না। ধূপ, মশা তাড়ানোর কয়েল, সুগন্ধি স্প্রে এবং তীব্র গন্ধযুক্ত পরিষ্কার করার সামগ্রী কারও কারও নাক ও শ্বাসনালিতে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। যাঁদের অ্যালার্জি আছে, তাঁদের এসব উপাদানের ব্যবহার সীমিত রাখা ভালো।
ঘরের কোথাও স্যাঁতসেঁতে ভাব বা ছত্রাক দেখা দিলে তার কারণ দূর করার ব্যবস্থা নিন। বাথরুম, রান্নাঘর এবং দেওয়ালের ভেজা অংশ পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
বাইরে বেরোনোর সময় সতর্ক থাকুন
ঠান্ডা বাতাসে নাকের সমস্যা বাড়লে বাইরে বেরোনোর সময় নাক ও মুখ হালকাভাবে ঢেকে রাখতে পারেন। এতে ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি সংস্পর্শ কিছুটা কমতে পারে। ধুলোময় পরিবেশে কাজ করলে উপযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করুন।
তবে মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি ধুলোবালি ও ধোঁয়ার উৎস এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার ধারে অতিরিক্ত ধোঁয়া বা ধুলো রয়েছে এমন স্থানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
সকালে কুয়াশার মধ্যে হাঁটতে গেলে যদি শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির সমস্যা বাড়ে, তবে সময় পরিবর্তন করে তুলনামূলক অনুকূল সময়ে হাঁটুন। হাঁটার সময় শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন।
নাকের যত্নে কী করবেন?
নাক বন্ধ থাকা বা নাকের ভেতরে শুষ্কতা অনুভূত হলে জীবাণুমুক্ত স্যালাইন ন্যাসাল স্প্রে অনেকের ক্ষেত্রে আরাম দিতে পারে। নাক ধোয়ার জন্য বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করলে নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত বা যথাযথভাবে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা জল ব্যবহার করতে হয়। সরাসরি কলের জল নাকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
নাকের ভেতরে জোর করে কিছু ঢোকাবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন নাক খোলার ওষুধযুক্ত স্প্রে ব্যবহার করবেন না। এ ধরনের কিছু স্প্রে দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে উল্টে নাক বন্ধ থাকার সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
গরম জলের বাষ্প নেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন। ফুটন্ত জলের পাত্রের ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে বাষ্প নেওয়া থেকে পোড়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে। অ্যালার্জির চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে বাষ্পের ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়।
খাবার, জল ও দৈনন্দিন অভ্যাস
অ্যালার্জি প্রতিরোধে কোনও একটি বিশেষ খাবার নিশ্চিতভাবে কাজ করে না। তবে সুষম খাদ্য শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ বা অন্যান্য উপযুক্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান।
শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও পর্যাপ্ত জল পান করুন। ঘরের পরিবেশ অতিরিক্ত শুষ্ক হলে উপযুক্ত আর্দ্রতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে ঘরে আর্দ্রতা খুব বেশি হলে ছত্রাক ও ধুলোর মাইটের সমস্যা বাড়তে পারে, তাই ভারসাম্য রাখা জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাক বদলানোও উপকারী অভ্যাস।
নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খাবেন না
অ্যালার্জির জন্য ব্যবহৃত কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধে ঘুম ঘুম ভাব হতে পারে। গাড়ি চালানো, যন্ত্র পরিচালনা করা বা মনোযোগের প্রয়োজন এমন কাজের আগে ওষুধের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং অন্য ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ওষুধ নির্বাচনে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
বারবার অ্যালার্জির সমস্যা হলে চিকিৎসক উপসর্গ ও কারণ বিবেচনা করে উপযুক্ত ওষুধ, ন্যাসাল স্প্রে বা প্রয়োজনে অ্যালার্জি পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাবেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নাক দিয়ে জল পড়া, হাঁচি বা নাক বন্ধ থাকার সমস্যা দীর্ঘদিন চললে, বারবার ফিরে এলে অথবা ঘুম ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঙ্গে জ্বর, তীব্র মুখব্যথা বা মাথাব্যথা, চোখের চারপাশে ফোলা কিংবা ক্রমশ বাড়তে থাকা উপসর্গ থাকলেও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
শ্বাস নিতে গুরুতর অসুবিধা, ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, গলা আটকে আসা কিংবা অ্যালার্জির সঙ্গে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
উপসংহার
শীতকালে অ্যালার্জি ও নাকের সমস্যা অনেকের জীবনযাত্রায় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিয়মিত বিছানার চাদর ও শীতবস্ত্র পরিষ্কার রাখা, ধোঁয়া ও ধুলো এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত জল পান এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শরীরের প্রতিটি মানুষের প্রতিক্রিয়া এক নয়। তাই নিজের উপসর্গের ধরন বুঝে সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই সুস্থ থাকার সঠিক পথ। শীতের আনন্দ উপভোগ করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, নিজের যত্ন নিন এবং পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করুন।












Leave a Reply