ফেজ—মরক্কোর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের শহর।।

মরক্কোর নাম শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাহারা মরুভূমি, উটের কাফেলা, রঙিন বাজার, মসলা, খেজুর, মাটির তৈরি বাড়ি এবং আরব-আফ্রিকান সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ। কিন্তু মরক্কোকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে শুধু মারাকেশ বা সাহারা দেখা যথেষ্ট নয়। ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও প্রাচীন নগরজীবনের এক অনন্য জগৎ দেখতে হলে যেতে হয় ফেজ শহরে।

ফেজ বা ফাস মরক্কোর অন্যতম ঐতিহাসিক শহর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শহর উত্তর আফ্রিকার শিক্ষা, ধর্ম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শহরের প্রাচীন অংশ ফেজ এল-বালি যেন এক বিশাল জীবন্ত জাদুঘর। এখানে সরু গলি, পুরনো মসজিদ, মাদ্রাসা, কারিগরদের দোকান, চামড়া রঙ করার প্রাচীন কারখানা, বাজার এবং ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলি মিলেমিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় সময় কয়েকশো বছর পিছিয়ে গেছে।

ফেজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার পুরনো শহর। গাড়ি বা আধুনিক যানবাহনের পরিবর্তে অনেক জায়গায় সরু গলির মধ্য দিয়ে মানুষ হাঁটেন, ছোট দোকানপাটে কারিগররা হাতে কাজ করেন এবং চারপাশে ভেসে আসে মশলা, চামড়া, রুটি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের গন্ধ। পর্যটকের কাছে এই অভিজ্ঞতা শুধু ভ্রমণ নয়—এ যেন ইতিহাসের ভিতর দিয়ে হাঁটা।

ফেজের ইতিহাস

ফেজের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরনো। শহরটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মরক্কোর ইদ্রিসি রাজবংশের নাম জড়িয়ে আছে। পরবর্তীকালে ফেজ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে। বিভিন্ন রাজবংশের সময় শহরটি সম্প্রসারিত হয় এবং এখানে গড়ে ওঠে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রাসাদ, বাজার ও আবাসিক এলাকা।

একসময় ফেজ ছিল উত্তর আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। আরব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী ও পণ্ডিতরা এখানে আসতেন। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ভাষা, আইন, চিকিৎসা ও গণিতসহ নানা বিষয়ে পড়াশোনা হতো।

শহরের এই শিক্ষাগত ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক আল-কারাওয়িয়িন। এটি শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ফেজ এল-বালি—এক জীবন্ত ইতিহাস

ফেজ ভ্রমণের মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে ফেজ এল-বালি। এটি শহরের প্রাচীনতম অংশ এবং বিশাল এক ঐতিহাসিক নগরাঞ্চল।

এখানে প্রবেশ করলেই আধুনিক শহরের চেহারা অনেকটাই হারিয়ে যায়। সরু রাস্তা, উঁচু দেয়াল, পুরনো কাঠের দরজা, ছোট ছোট দোকান এবং মানুষের ব্যস্ত চলাচল—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ।

ফেজ এল-বালির গলিগুলি এতটাই জটিল যে প্রথমবার গেলে সহজেই পথ হারিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই কারণেই স্থানীয় গাইড নিয়ে ঘোরা অনেকের কাছে সুবিধাজনক হতে পারে।

এই এলাকার সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো—এটি শুধু পর্যটকদের জন্য সাজানো কোনো ঐতিহাসিক স্থান নয়। এখানকার মানুষ এখনও বসবাস করেন, দোকান চালান, কারুশিল্প তৈরি করেন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন করেন।

অর্থাৎ ফেজ এল-বালি একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমান।

বাব বুজলুদ—নীল দরজা

ফেজের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্য হলো বাব বুজলুদ। এটি পুরনো শহরের একটি বিখ্যাত প্রবেশদ্বার।

দরজাটির নকশায় মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ দেখা যায়। নীল রঙের টাইলস ও জ্যামিতিক নকশা এটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

দরজার সামনে দাঁড়ালে একদিকে আধুনিক শহর, অন্যদিকে প্রাচীন ফেজের গলি—দুই ভিন্ন সময়কে একসঙ্গে দেখা যায়।

সন্ধ্যার সময় এই এলাকা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পর্যটক, স্থানীয় মানুষ, দোকানদার এবং রাস্তার খাবারের বিক্রেতাদের ভিড়ে চারপাশে তৈরি হয় উৎসবের মতো পরিবেশ।

আল-কারাওয়িয়িন—জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য

ফেজের ইতিহাসে আল-কারাওয়িয়িনের গুরুত্ব অপরিসীম। নবম শতকে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।

এখানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বিভিন্ন সময়ে ভাষা, আইন, দর্শন, গণিত এবং অন্যান্য জ্ঞানচর্চাও হয়েছে।

ভবনের স্থাপত্যও অসাধারণ। ঐতিহ্যবাহী মোজাইক টাইলস, খোদাই করা কাঠ, আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং সুশোভিত প্রাঙ্গণ মরক্কোর ইসলামি স্থাপত্যের সৌন্দর্য তুলে ধরে।

ফেজে গেলে এই স্থানের ইতিহাস সম্পর্কে জানা শহরটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে।

বু ইনানিয়া মাদ্রাসা

ফেজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো বু ইনানিয়া মাদ্রাসা।

মেরিনিড আমলের এই স্থাপত্যে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী নকশার অসাধারণ ব্যবহার দেখা যায়। জেলিজ টাইলস, কাঠের কারুকাজ, স্টুকো অলংকরণ এবং আরবি লিপির ব্যবহার ভবনটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করেছে।

ভবনের অভ্যন্তরে ঢুকলে বোঝা যায়, অতীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পড়াশোনার জায়গা ছিল না; স্থাপত্য ও শিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

ফেজের চামড়ার ট্যানারি

ফেজের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যগুলির একটি হলো ঐতিহ্যবাহী চামড়ার ট্যানারি।

চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পুরনো পদ্ধতি এখনও এখানে অনেকাংশে দেখা যায়। বিভিন্ন রঙের বড় বড় পাত্রে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের দৃশ্য ওপর থেকে দেখলে যেন বিশাল রঙের প্যালেটের মতো মনে হয়।

চামড়া পরিষ্কার, নরম করা, রঙ করা এবং শুকিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন ধাপ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে।

এখান থেকে তৈরি চামড়ার ব্যাগ, জুতো, বেল্ট, জ্যাকেট, মানিব্যাগসহ নানা পণ্য ফেজের বাজারে বিক্রি হয়।

তবে ট্যানারির গন্ধ বেশ তীব্র হতে পারে। তাই পর্যটকদের জন্য পুদিনা পাতা দেওয়া হয়, যা নাকে ধরে গন্ধ কিছুটা কম অনুভব করা যায়।

ফেজের বাজার—সুক

ফেজের বাজারকে শুধু বাজার বললে এর গুরুত্ব কমিয়ে বলা হয়। এটি আসলে শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সরু গলির দুই পাশে ছোট ছোট দোকান। কোথাও মশলা, কোথাও কার্পেট, কোথাও চামড়ার সামগ্রী, কোথাও ধাতুর তৈরি লণ্ঠন, কোথাও কাঠের কারুশিল্প।

রঙের বৈচিত্র্যও অসাধারণ।

লাল মরিচ, হলুদ মশলা, সবুজ পুদিনা, শুকনো ফল, নানা ধরনের কাপড় এবং রঙিন মৃৎপাত্র মিলিয়ে বাজার যেন এক বিশাল রঙের ক্যানভাস।

পর্যটকদের কাছে দরদাম করাও বাজারের অভিজ্ঞতার একটি অংশ। তবে কেনাকাটার সময় শান্তভাবে দাম তুলনা করা এবং পণ্যের মান যাচাই করা ভালো।

ফেজের কারুশিল্প

ফেজের পরিচিতির অন্যতম ভিত্তি হলো কারুশিল্প।

এখানকার কারিগররা বহু প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরি করে আসছেন।

জেলিজ টাইলস, চামড়ার সামগ্রী, কার্পেট, কাঠের খোদাই, ধাতুর লণ্ঠন, মৃৎশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক ফেজের বাজারে বিশেষভাবে পরিচিত।

বিশেষ করে জেলিজ মোজাইক মরক্কোর স্থাপত্যের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ছোট ছোট জ্যামিতিক টাইলস সাজিয়ে তৈরি করা হয় জটিল নকশা।

এই কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

ফেজের রিয়াদ

ফেজে থাকার অভিজ্ঞতাকে বিশেষ করে তোলে রিয়াদ।

রিয়াদ হলো ঐতিহ্যবাহী মরক্কোর বাড়ি, যার সাধারণত বাইরের দিকে খুব বেশি অলংকরণ থাকে না, কিন্তু ভেতরে থাকে একটি সুন্দর কেন্দ্রীয় উঠোন।

অনেক পুরনো বাড়িকে এখন অতিথিশালা বা বুটিক হোটেলে রূপান্তর করা হয়েছে।

ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় টাইলসের নকশা, কাঠের কারুকাজ, ফোয়ারা, গাছপালা এবং ঐতিহ্যবাহী আসবাব।

রিয়াদে থাকার ফলে পর্যটক শুধু একটি হোটেলে রাত কাটান না; বরং মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপনের একটি অংশ অনুভব করতে পারেন।

ফেজের খাবার

মরক্কোর খাবার তার সংস্কৃতির মতোই বৈচিত্র্যময়।

ফেজে গেলে অবশ্যই স্থানীয় খাবার চেষ্টা করা উচিত।

তাজিন অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। মাংস, সবজি, মশলা এবং কখনও শুকনো ফল দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা এই খাবার বিশেষ ধরনের মাটির পাত্রে পরিবেশন করা হয়।

কুসকুসও মরক্কোর বিখ্যাত খাবার।

এছাড়া হারিরা নামের স্যুপ, বিভিন্ন ধরনের রুটি, অলিভ, খেজুর, বাদাম এবং মিষ্টি পাওয়া যায়।

মরক্কোর পুদিনা চা অত্যন্ত জনপ্রিয়। ছোট গ্লাসে মিষ্টি পুদিনা চা পরিবেশনের নিজস্ব একটি ঐতিহ্য রয়েছে।

ফেজের কোনো ছোট স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বসে চা বা খাবার খাওয়াও ভ্রমণের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।

ফেজের স্থাপত্য

ফেজের স্থাপত্যে আরব, ইসলামি এবং উত্তর আফ্রিকান ঐতিহ্যের সমন্বয় দেখা যায়।

জেলিজ টাইলস, জ্যামিতিক নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফি, কাঠের ছাদ এবং খিলান—সব মিলিয়ে স্থাপত্যের নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি হয়েছে।

এখানকার বাড়িগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো গোপনীয়তা। বাইরের দিক তুলনামূলকভাবে সাদামাটা হলেও ভেতরের উঠোন অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো হয়।

এই নকশা মরক্কোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও যুক্ত।

মেল্লাহ—ইহুদি ঐতিহ্যের স্মৃতি

ফেজের ইতিহাসে ইহুদি সম্প্রদায়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শহরের মেল্লাহ বা ঐতিহাসিক ইহুদি কোয়ার্টার সেই ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে।

এখানে পুরনো উপাসনালয়, বাড়িঘর এবং স্থাপত্যের বিভিন্ন নিদর্শন দেখা যায়।

মরক্কোর ইতিহাস যে বহু সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে, মেল্লাহ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ফেজ থেকে ভলুবিলিস

ফেজ ভ্রমণের সঙ্গে কাছাকাছি ঐতিহাসিক স্থান ভলুবিলিস ঘুরে দেখা যায়।

ভলুবিলিস প্রাচীন রোমান সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। এখানে পুরনো রাস্তা, স্তম্ভ, স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এবং মোজাইক দেখা যায়।

একদিকে ফেজের ইসলামি ও মরক্কোর ঐতিহ্য, অন্যদিকে রোমান সভ্যতার নিদর্শন—এই বৈপরীত্য ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে।

মেকনেস ও মৌলে ইদ্রিস

ফেজের আশপাশে মেকনেস এবং মৌলে ইদ্রিসও ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।

মেকনেস মরক্কোর ঐতিহাসিক রাজকীয় শহরগুলির একটি। এখানে পুরনো প্রাসাদ, দরজা ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখা যায়।

মৌলে ইদ্রিস একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা এই শহরের দৃশ্যও অত্যন্ত সুন্দর।

ফেজকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে এই স্থানগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

ফেজে হাঁটার আনন্দ

ফেজকে গাড়ির জানালা দিয়ে দেখলে শহরের প্রকৃত সৌন্দর্যের অনেকটাই অদেখা থেকে যাবে।

এই শহরকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো হাঁটা।

সরু গলি ধরে এগোতে এগোতে কখনও দেখা যাবে একজন কারিগর কাঠ খোদাই করছেন, কখনও কেউ চামড়ার পণ্য তৈরি করছেন, আবার কোথাও মশলার দোকান থেকে সুগন্ধ ভেসে আসছে।

কখনও কোনো ছোট উঠোনের দরজা খুলে দেখা যাবে সুন্দর একটি রিয়াদ।

এই অনিশ্চিত আবিষ্কারই ফেজের ভ্রমণকে বিশেষ করে তোলে।

ফেজের সকাল

ভোরের ফেজ আর দিনের ব্যস্ত ফেজ এক নয়।

সকালে পুরনো শহরের গলিতে মানুষের ভিড় তুলনামূলক কম থাকে। দোকান ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে। রুটি ও চায়ের গন্ধ ভেসে আসে।

ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির সামনে তখন পর্যটকদের ভিড়ও কম থাকে।

তাই ফেজের সৌন্দর্য শান্তভাবে উপভোগ করতে চাইলে সকালটা হাঁটার জন্য আদর্শ সময় হতে পারে।

সন্ধ্যার ফেজ

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো শহরের চরিত্র বদলে যায়।

দোকানের আলো জ্বলে ওঠে। খাবারের দোকানগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষ কেনাকাটা করতে বের হন।

মসজিদের আজানের ধ্বনি, মানুষের কথাবার্তা, খাবারের গন্ধ এবং বাজারের আলো মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।

সন্ধ্যার এই মুহূর্তে ফেজকে অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয়।

ফেজের মানুষ ও সংস্কৃতি

মরক্কোর সংস্কৃতিতে আতিথেয়তার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ফেজের মানুষও অতিথিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য পরিচিত। তবে পর্যটকদের মনে রাখা উচিত, এটি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়—এটি মানুষের বাসস্থান ও কর্মস্থল।

তাই স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।

বিশেষ করে ধর্মীয় স্থানে পোশাক ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।

ফেজে যাওয়ার সেরা সময়

ফেজে ভ্রমণের জন্য বসন্ত ও শরৎ সাধারণত আরামদায়ক সময় হতে পারে।

বসন্তে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং শহর ঘোরার জন্য পরিবেশ আরামদায়ক।

শরৎকালেও তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক।

গ্রীষ্মে দিনের বেলা গরম বেশি হতে পারে। তাই সেই সময়ে সকালে ও বিকেলে ঘোরাঘুরি করা সুবিধাজনক।

শীতকালে দিনের তাপমাত্রা আরামদায়ক হলেও রাতে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে।

ভারত থেকে ফেজ ভ্রমণ

ভারত থেকে ফেজ যেতে হলে সাধারণত আন্তর্জাতিক বিমানপথ ব্যবহার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ভিসা ও প্রবেশ সংক্রান্ত নিয়ম আগে যাচাই করা উচিত।

ফেজের বিমানবন্দর শহরের সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত।

মরক্কোর অন্য শহর থেকেও ট্রেন বা সড়কপথে ফেজে পৌঁছানো যায়।

মরক্কো ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে ফেজের সঙ্গে মারাকেশ, কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, সাহারা অঞ্চলের কোনো অংশ এবং শেফশাওয়েনের মতো স্থান মিলিয়ে একটি দীর্ঘ ভ্রমণসূচি তৈরি করা যায়।

ফেজে কতদিন থাকবেন?

ফেজের জন্য অন্তত দুই থেকে তিন দিন রাখা ভালো।

প্রথম দিনে পুরনো শহর, বাব বুজলুদ, বু ইনানিয়া এবং বাজার ঘোরা যায়।

দ্বিতীয় দিনে আল-কারাওয়িয়িন, ট্যানারি, কারুশিল্পের এলাকা এবং ঐতিহাসিক কোয়ার্টার দেখা যেতে পারে।

তৃতীয় দিনে ভলুবিলিস, মেকনেস বা আশপাশের কোনো জায়গায় দিনের ভ্রমণ করা যায়।

আরও সময় থাকলে ধীরে ধীরে শহরের বিভিন্ন গলি, বাজার ও স্থানীয় খাবার আবিষ্কার করা যায়।

ফেজে ভ্রমণের কিছু সতর্কতা

ফেজের পুরনো শহরের গলি জটিল হওয়ায় প্রথমবার গেলে মানচিত্র বা নির্ভরযোগ্য স্থানীয় গাইড কাজে লাগতে পারে।

দরদাম করার আগে পণ্যের দাম সম্পর্কে ধারণা নেওয়া ভালো।

ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের দিকে নজর রাখা উচিত, বিশেষ করে ভিড়ের বাজারে।

ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফেজকে তাড়াহুড়ো করে দেখার শহর হিসেবে না দেখে ধীরে ধীরে অনুভব করা।

ফেজ কেন আলাদা?

পৃথিবীর অনেক শহরে ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। অনেক শহরে পুরনো বাজারও আছে। কিন্তু ফেজের বিশেষত্ব হলো—এখানে ইতিহাস কোনো আলাদা জাদুঘরের মধ্যে বন্দি নয়।

ইতিহাস এখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

একজন কারিগর আজও বহু পুরনো পদ্ধতিতে কাজ করছেন। কোনো দোকানের পণ্য বহু প্রজন্মের কারুশিল্পের ধারাবাহিকতা বহন করছে। একটি গলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চলাচল দেখেছে।

এই কারণেই ফেজে ভ্রমণ মানে শুধু কয়েকটি স্থাপনা দেখা নয়। এটি একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

উপসংহার

ফেজ এমন একটি শহর, যেখানে আধুনিক পৃথিবীর ব্যস্ততার মাঝেও অতীতের অনেকটা অংশ জীবিত রয়েছে।

পুরনো শহরের সরু গলি, নীল দরজা, মাদ্রাসার কারুকাজ, আল-কারাওয়িয়িনের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য, চামড়ার ট্যানারি, রঙিন বাজার, রিয়াদের উঠোন, পুদিনা চা এবং মরক্কোর সুগন্ধি খাবার—সব মিলিয়ে ফেজ একটি সম্পূর্ণ ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

যে ভ্রমণকারী শুধু সুন্দর ছবি তুলতে চান, তাঁর জন্যও ফেজ আকর্ষণীয়। আর যিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখতে চান, তাঁর কাছে ফেজ আরও বেশি মূল্যবান।

ফেজের গলিতে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো কোনো এক মুহূর্তে মনে হবে—আধুনিক পৃথিবীটা যেন পিছনে পড়ে গেছে। সামনে শুধু পুরনো এক শহর, যার প্রতিটি দরজা, প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি বাজার এবং প্রতিটি কারিগরের হাতে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দীর গল্প।

সেই গল্পের নাম—ফেজ।

==========  শেষ ==========

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *